Support 4thPillars

×
  • আমরা
  • নজরে
  • ছবি
  • ভিডিও

  • গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার বার্তা দিচ্ছে নতুন বছর

    রজত রায় | 02-01-2021

    আন্দোলনের সামনে ঝুঁকতে বাধ্য হচ্ছে কেন্দ্র

    2019 সালে কেন্দ্রে নরেন্দ্র মোদী সরকারের দ্বিতীয় পর্বের শুরুতেই দেশ দেখেছিল কাশ্মীরের সংবিধানপ্রদত্ত স্বাধিকার ও বিশেষ অবস্থানের স্বীকৃতিমূলক 370 ধারার অবলুপ্তি। গোটা কাশ্মীরকে মাসের পর মাস যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রেখে, সেখানকার জননেতাদের কারারুদ্ধ করে সরকার সেনাবাহিনী দিয়ে কাশ্মীর সমস্যার স্থায়ী সমাধানের পথে এগনোর দাবি করছিল। আবার অসমে রাজ্যে জাতীয় নাগরিক পঞ্জির (NRC) সুবাদে সে রাজ্যে বহিরাগত ও বিদেশিদের সনাক্ত করার প্রক্রিয়ায় প্রায় 19 লক্ষ মানুষকে বিদেশি বলে চিহ্নিত করা হয়, যার মধ্যে 12 লক্ষের বেশি ছিল হিন্দু। আর অযোধ্যায় বাবরি মসজিদ মামলার অভিনব নিষ্পত্তি করে মসজিদ ভাঙাকে অপরাধমূলক কাজ বলে স্বীকার করার সঙ্গেই সুপ্রিম কোর্ট বিবদমান জমি হিন্দুদের মন্দির বানানোর জন্য দিয়ে এক অভূতপূর্ব নজির সৃষ্টি করল। সব মিলিয়ে পরিস্থিতি এমন দাঁড়ায় যে রোমিলা থাপারের মতো ঐতিহাসিক বলতে বাধ্য হয়েছেন, যে ভারতে এখন হিন্দুরাষ্ট্র নির্মাণের প্রক্রিয়া শুরু হয়ে গিয়েছে

     

    সে দিক থেকে দেখলে 2019 যদি উগ্র হিন্দুত্ববাদীদের নানা ফ্রন্টে আগ্রাসী অভিযানের দ্যোতক হয়ে থাকে, তা হলে 2020 অবশ্যই এই হিন্দুত্ববাদীদের বিরুদ্ধে জনগণের প্রতিরোধের কাল। বছর শুরু হয়েছিল শাহিনবাগের আন্দোলন দিয়ে। কেন্দ্রীয় সরকার  NRC, CAA NPR এর মিলিত আক্রমণে যে ভাবে দেশের মানুষের একাংশের নাগরিকত্ব হরণের চেষ্টা শুরু করেছে, তার বিরুদ্ধে দেশ জুড়ে আন্দোলন শুরু হয় 2020 সালে। দিল্লির শাহিনবাগে ধর্নায় বসা মহিলারা হয়ে ওঠেন ওই প্রতিবাদী আন্দোলনের প্রতীক। এর পর কোভিড 19 মহামারী রুখতে সরকার আচমকাই বিনা প্রস্তুতিতে দেশ জুড়ে লকডাউন শুরু করলে রাজ্যে রাজ্যে ছড়িয়ে থাকা পরিযায়ী শ্রমিকরা কাজ হারিয়ে ঘরমুখো হতে বাধ্য হন। ট্রেন বা সড়ক পরিবহণ বন্ধ থাকায় তাঁরা পায়ে হেঁটে হাজার হাজার মাইল অতিক্রম করতে বাধ্য হন। ওই পদযাত্রা প্রায়শই রক্তাক্ত হয়ে উঠেছিল এবং বহু শ্রমিক রেলের তলায়, দ্রুত ধাবমান গাড়ির ধাক্কায় প্রাণ দেন, অনেকে না খেয়ে, তৃষ্ণায় মারা যান। লকডাউন ভাঙার অপরাধে সরকার দমনপীড়ন শুরু করলেও তা উপেক্ষা করে পরিযায়ী শ্রমিকরা নিজেদের লক্ষ্যে অবিচল থেকে শেষে সরকারকে বাধ্য করেন তাদের জন্য বিশেষ ট্রেন বাস ইত্যাদি চালাতে। পরিযায়ী শ্রমিকরা বহু প্রাণের বিনিময়ে বৃহত্তর সমাজ, রাষ্ট্রকে (এমনকী সুপ্রিম কোর্ট-সহ) একপ্রকার বাধ্য করেছিল তাদের জন্য পরিবহণের ব্যবস্থা, বিনামূল্যে খাদ্য সরবরাহ করতে, বিকল্প রোজগারের ব্যবস্থা নিয়ে ভাবনাচিন্তা করতে

     

    আরও পড়ুন: রাজপথে কৃষক 4: সংস্কার প্রয়োজন, তবে তা কর্পোরেটের স্বার্থে নয়

     

    2020 সালে দু’টি রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচন হয়েছে। তার মধ্যে দিল্লিতে আম আদমি পার্টির হাতে বিজেপি শোচনীয় ভাবে হারে, বিহারে বিজেপি-জনতা দল (সমাজবাদী) জোট কোনও রকমে ক্ষমতায় টিকে থাকলেও, আগের থেকে অনেক জমি হারিয়েছে। আরও একটি নির্বাচনের ফলও গুরুত্বপূর্ণ। যে জম্মু ও কাশ্মীরের বিশেষ সাংবিধানিক অধিকার কেড়ে নিয়ে বিজেপি সরকার উল্লাস করছিল, সেখানে স্থানীয় সরকারের ভোটে তারা হেরে গেছে তাদেরই কাছে, যাদের তারা এতদিন ধরে দেশবিরোধী শক্তির তকমা দিচ্ছিল। দেশের অর্থনীতি মুখ থুবড়ে পড়েছিল আগেই, করোনা মহামারী এসে তাতে আরও ঘা দিয়েছে। গত নভেম্বরে দেশ জুড়ে একদিনের শিল্প ধর্মঘট বুঝিয়ে দিয়েছে যে অসন্তোষ জমা হচ্ছে শ্রমিক মহলেও

     

    কিন্তু সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ এল দেশের কৃষকসমাজের কাছ থেকে। সরকার কোনও আলাপ আলোচনা ছাড়াই কৃষিক্ষেত্রে সংস্কারের জন্য তিনটি আইন তড়িঘড়ি পাস করিয়ে কৃষি বিপণণে বড় পুঁজির জন্য দরজা খুলে দেয়। এর প্রতিবাদে কেন্দ্রে বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ জোট সরকার থেকে বিজেপির সবচেয়ে পুরনো জোটসঙ্গী পঞ্জাবের অকালি দল বেরিয়ে আসে। দিকে দিকে কৃষকদের রাস্তা অবরোধ, রেল অবরোধ, ধর্না শুরু হয়। সরকার উপেক্ষা করতে থাকায় কৃষকরা এ বার রাজধানী দিল্লিতে এসে কথা বলতে চায়। শুরু হয় হাজারে হাজারে কৃষকের দিল্লি অভিযান। তাদের ঠেকাতে সরকার দিল্লি সীমানার বিভিন্ন প্রবেশ পথে রাস্তা কেটে, ব্যারিকেড দিয়ে গোটা দিল্লিকেই কার্যত সড়কপথে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে সরকার। কৃষকরা ওই তিন আইন বাতিলের দাবিতে অনড়, সেই সঙ্গে ফসলের ন্যূনতম সহায়ক মূল্য (minimum support price বা MSP)কে আইনি স্বীকৃতি দেওয়ার দাবি তুলেছে। সরকার দৃশ্যতই কোণঠাসা। সাত দফা আলোচনা হয়ে গেছে, আরও হবে। লক্ষ্যণীয়, কৃষকদের এই আন্দোলনকে সরকার গোড়ায় খলিস্তানি, পাকিস্তানি মদতপুষ্ট বলে কালিমা লেপনের চেষ্টা করলেও, তা ধোপে টেকেনি। বরং সরকার এই তথাকথিত দেশবিরোধীদের সঙ্গেই বার বার বৈঠকে বসতে বাধ্য হচ্ছে। এই আন্দোলন এখনও বেড়ে চলেছে

     

    প্রচলিত বিরোধী আন্দোলনের বদলে এই রাজনৈতিক রং বিবর্জিত গণআন্দোলনের সামনে সরকারের অসহায়তা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে, যেমনটা যাচ্ছিল শাহিনবাগ আন্দোলনের সময়। প্রচলিত রাজনৈতিক আন্দোলনের রীতির বিপরীতে এই কৃষক আন্দোলনের কোনও নির্দিষ্ট রাজনৈতিক মতবাদের প্রতিনিধিত্ব নেই। নেই কোনও ব্যক্তিকেন্দ্রিক নেতৃত্বও। তার জায়গা নিয়েছে এক যৌথ নেতৃত্ব, যেখানে ৩০টির বেশি কৃষক সংগঠনের প্রতিনিধিরা রয়েছেন। বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলি অনেকেই সোশ্যাল মিডিয়ায় এই আন্দোলনকে সমর্থন জানাচ্ছে। অনেক বিরোধী নেতা ও কর্মী আন্দোলনের জায়গায় গিয়েও সমর্থন জানাচ্ছেন। কিন্তু কৃষকরা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, তাঁরা আসতেই পারেন, কিন্তু দলীয় পতাকা নিয়ে আসা চলবে না, আর কৃষকদের মঞ্চে উঠে বক্তৃতা দিতে পারবেন না। সরকারের সঙ্গে বৈঠকে অংশ নেওয়ার সময়েও কৃষক প্রতিনিধিরা সরকার পক্ষের দেওয়া চা জলখাবার না খেয়ে নিজেদের সঙ্গে করে আনা চা খাচ্ছেন

     

    দেশের বহু সংবাদমাধ্যম (যার মধ্যে সংবাদপত্র, টিভি চ্যানেল ও ডিজিটাল মিডিয়া রয়েছে) বেশ কিছুদিন ধরেই কর্পোরেট দুনিয়ার পকেটস্থ, এবং তারা এখন কেন্দ্রে ও রাজ্যে রাজ্যে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের হয়ে প্রচারে ব্যস্ত। শাসকশ্রেণির সুরে সুর মিলিয়ে এরা বিরুদ্ধ স্বর বা প্রতিবাদী গণআন্দোলনের বিরুদ্ধে মিথ্যা প্রচারে রত। কৃষক আন্দোলন যে ভাবে প্রকাশ্যেই এদের ‘ফেক মিডিয়া’ ও ‘গোদি মিডিয়া’ বলে মুখোশ খুলে দিয়েছে, তা অভিনব। এ ভাবে তাঁরা গণতান্ত্রিক আন্দোলনের প্রচলিত শৈলির আমূল সংস্কার করতে শুরু করেছেন যা কিনা আগামী দিনে দেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের নতুন প্রকরণ ও ধারা সৃষ্টির সম্ভাবনা জাগায়। কিন্তু সবচেয়ে বড় কথা, এই সব গণতান্ত্রিক আন্দোলন সমগ্র দেশের সামনে এই আশা জাগায়, যে স্বৈরতন্ত্রী রাষ্ট্রশক্তিকেও গণতান্ত্রিক আন্দোলনের মাধ্যমে প্রতিরোধ করা সম্ভব

     

    প্রতি বছরই 1 জানুয়ারি আম্বেদকরপন্থী দলিতরা 1818 সালে পেশোয়া বাজিরাও 2 এর বাহিনীর বিরুদ্ধে ইংরেজদের হয়ে দলিত সেনাদের যুদ্ধজয়ের স্মৃতিতে পুণে শহরের ভীমা কোরেগাঁও এলাকায় স্থাপিত বিজয়স্তম্ভের সামনে জড়ো হয়ে উৎসব করে। এলগার পরিষদ (যার অর্থ, সোচ্চার হওয়ার মঞ্চ) এই কর্মসূচি নিয়ে থাকে। 2018 সালে ওই যুদ্ধজয়ের 200 বছর পূর্তি উপলক্ষে এলগার পরিষদের ওই অনুষ্ঠানের সময় দলিতদের সঙ্গে মারাঠিদের সংঘর্ষ বাধলে একজনের মৃত্যু হয়। এর পর পুলিশ দফায় দফায় 16 জন বুদ্ধিজীবীকে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে গ্রেফতার করে কোনও প্রমাণ ছাড়াই তাঁদের সঙ্গে মাওবাদীদের যোগ থাকার অভিযোগ আনে। এঁদের মধ্যে বেশ কয়েকজন দেশবরেণ্য শিক্ষাবিদ ও সমাজকর্মী রয়েছেন। তাঁদের বিনা বিচারে কারারুদ্ধ করে রাখা হয়েছে। এ ছাড়াও আরও বহু গ্রেফতারের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্র প্রমাণ করে দিয়েছে, সরকারের বিরুদ্ধে মত প্রকাশের মোকাবিলায় এটাই তাদের নীতি

     

    কিন্তু সিএএ বিরোধী আন্দোলন ও কৃষক আন্দোলনের মধ্য দিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে যে স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের সাহস বেড়ে চলেছে, তারই ইঙ্গিত দিয়ে ভীমা কোরেগাঁও শৌর্য দিবস উপলক্ষে এলগার পরিষদ পুণে শহরে সাংবাদিক সম্মেলন করে জানিয়েছে যে আগামী 30 জানুয়ারি আবারও তারা এলগার পরিষদের প্রকাশ্য অনুষ্ঠান করবে পুণে-সহ দেশের বিভিন্ন শহরের রাস্তায়

     

    এই পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে 2021 সালে আমরা আশাবাদী হতেই পারি যে করোনার ভ্যাকসিন যেমন এসে আরও বেশি বেশি করে সাধারণ মানুষের প্রকাশ্য জমায়েত সম্ভব করে তুলবে, তেমনই রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে জনসাধারণের প্রতিরোধ আন্দোলন আরও গতি পাবে। সমস্যা রয়েছে অনেক। এখনও কৃষক, শ্রমিক, সরকারি ও বেসরকারি ক্ষেত্রের কর্মীবৃন্দ, দলিত, সিএএ বিরোধী আন্দোলন আলাদা আলাদা সমান্তরাল ধারায় বইছে। যদিও তাদের অভিমুখ একটাই—দেশে স্বৈরতন্ত্রের অবসান ঘটিয়ে গণতন্ত্রকে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করা। হয়তো সে পথেই এই আন্দোলনগুলি এসে মিশে যাবে। নতুন বছরে তারই বার্তা আসতে পারে। স্বাগত 2021

     


    রজত রায় - এর অন্যান্য লেখা


    কৃষিজ পণ্যের পাইকারি বাজারও এখন বন্ধ। ফলে, চাষি তাঁর ফসল বাজারে বিক্রি করতে পারছেন না।

    ইতিহাসের পুরনো ক্ষত বাঙালি ভদ্রলোকদের বিজেপি-প্রেমী করে তুলেছে।

    মোদীর দীপাবলী দেশজুড়ে বিদ্যুৎ বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।

    করোনার বিরুদ্ধে ভারতের লড়াই অসংগঠিত। নির্দিষ্ট পন্থার বদলে একাধিক পরস্পরবিযুক্ত বা পরস্পরবিরোধী

    করোনা মোকাবিলায় মোমবাতি নাটক দেশবাসীর কাছে দীপাবলির পরে অমাবস্যাকে ফিরিয়ে আনতে পারে।

    স্থানীয় নির্বাচনে বিরোধী গুপকার জোটের সাফল্য বিজেপির কাশ্মীর নীতির প্রতি অনাস্থা।

    গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার বার্তা দিচ্ছে নতুন বছর-4thpillars