Support 4thPillars

×
  • আমরা
  • নজরে
  • ছবি
  • ভিডিও

  • কেরালায় কনট্রোলে করোনা: ম্যাজিক নয়, শুধু স্ট্র্যাটেজি আর শিক্ষা

    রজত কর্মকার | 15-04-2020

    প্রতীকী ছবি

    ট্রেনে আমার মতো পর্যটকের সংখ্যা নেহাতই হাতে গোনা। সংখ্যাগরিষ্ঠই নিত্যযাত্রী। বিভিন্ন অফিসে কাজ করেন। স্লিপার ক্লাসে ছিলাম। সকাল সাতটায় বার্থ নামিয়ে জানালার ধারে বসে বাইরের দৃশ্য উপভোগ করছিলাম। চটক ভাঙল মধ্যবয়সি এক মহিলার প্রশ্নে। জিজ্ঞাসা করলেন, ‘মে আই সিট হিয়ার?’ খানিকটা অপ্রস্তুত হয়ে গিয়েছিলাম। এত বড় সিট, আমি এক কোণে জানালার ধারে বসে রয়েছি, বলার কোনও প্রয়োজনই নেই। বসলেই হয়। পরবর্তী প্রশ্নে খানিক অপ্রস্তুত হয়ে পড়লাম, জিজ্ঞাসা করলেন, ‘অ্যাম আই ডিসটার্বিং ইউ?’ তড়িঘড়ি সিট ছেড়ে উঠে বললাম, ‘নো নো, প্লিজ বি সিটেড।’ উত্তরে হেসে ‘থ্যাঙ্ক ইউ’ বলে সিটে বসে ব্যাগ থেকে বই বার করে পড়তে শুরু করলেন অপরিচিতা। ঘোর কাটিয়ে আমি ফের জানালার বাইরে চোখ রাখলাম।

     

    ট্রেনের গতি ধীরে ধীরে কমে আসছে। ইচ্ছে করেই সিট ছেড়ে লোটা-কম্বল নিয়ে দরজার কাছে ভিড় করিনি। কারণ সকলেই নিজের নিজের আসনে বসে রয়েছেন। আগেভাগে উঠে গেলে বেশ বেমানান লাগত। বেশিরভাগ ব্যক্তির হাতে বই। নিবিষ্ট মনে পড়ছেন। কোন স্টেশন এল, কোনটা গেল তার হিসেব রাখছেন মনেই। এর মধ্যেই গন্তব্যে, মানে কেরালার অন্যতম বড় জংশন এর্নাকুলম স্টেশনে ঢুকছে ট্রেন। এখানেই সকলে নেমে পড়বেন। এর আগে পথে যত স্টেশন পড়েছে প্রায় সব জায়গায় টিভির আওয়াজই স্টেশনের প্রধান শব্দ দূষণের কারণ ছিল। অনেক মানুষের উপস্থিতি থাকলেও, তাঁদের আওয়াজ প্রায় শোনাই যায়নি। এর্নাকুলমেও তার অন্যথা হল না। ট্রেন থামার পর প্রত্যেকে ধীরে সুস্থে নেমে বাইরের পথ ধরলেন। অনেকেই কথা বলছেন, কিন্তু তা শুনতে গেলে একেবারে গা ঘেঁষে দাঁড়াতে হবে। স্টেশনের বাইরে অটো, ট্যাক্সি যে যেমন পারছেন ধরে গন্তব্যে চলে যাচ্ছেন। স্টেশনে টি স্টল থাকলেও স্টেশনের বাইরে কোনও চায়ের দোকান বা খবরের কাগজ হাতে জটলা চোখে পড়েনি।

     

    লেখার জন্য এত দীর্ঘ ভূমিকা প্রয়োজন ছিল। সে জন্যেই এতগুলো শব্দ খরচ করলাম। উপরের দৃশ্যের সঙ্গে দেশের যে কোনও রাজ্যের বড় জংশন স্টেশনের পার্থক্য বুঝতে নোবেল লরিয়েট হওয়ার প্রয়োজন নেই। কর্মসূত্রে এবং ঘোরার নেশা থাকায় অনেক রাজ্যে যেতে হয়েছে। ‘ঈশ্বরের আপন দেশ’-এ এসে বাকি দেশের সঙ্গে এই বিরাট পার্থক্য আমাকেও নাড়িয়ে দিয়েছিল।

     

    এ বার প্রসঙ্গে আসা যাক। খবরের কাগজের সঙ্গে প্রতিদিনের যাঁদের যোগাযোগ রয়েছে তাঁরা নিশ্চয়ই জানবেন, দেশের প্রথম করোনা আক্রান্ত ধরা পড়েছিল কেরালায়। গত জানুয়ারি মাসের 30 তারিখ। উহান থেকে ফেরা এক ডাক্তারি ছাত্র করোনা আক্রান্ত হন। এক সময় দেশের মধ্যে করোনা আক্রান্তের সংখ্যায় একেবারে শীর্ষে ছিল কেরালা। সেখান থেকে করোনা রোগীদের সুস্থ হওয়ার বিচারে দেশের মধ্যে এখন প্রথম স্থানে। করোনা ঠেকানোয় WHO কেরালার ভূমিকার অকুণ্ঠ প্রশংসা করেছে। কীভাবে মহামারী রোধ করা যায় তার আদর্শ উদাহরণ হিসাবে তুলে ধরা হচ্ছে কেরালার ‘সাকসেস স্টোরি’

     

    কীভাবে সম্ভব হল এই অসম্ভব? কারণ খুঁজতে গিয়ে তিনটি বিষয় বেশ স্পষ্ট হয়ে উঠল। প্রথম, অত্যন্ত দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ। দ্বিতীয়, প্রশাসনিক স্ট্র্যাটেজি। তৃতীয় এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, সে রাজ্যে প্রকৃত শিক্ষিতের সংখ্যাএক এক করে বিষয়গুলিকে একটু দেখে নেওয়া যাক।

     

    দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ

    30 জানুয়ারি রাজ্য এবং দেশের প্রথম করোনা ভাইরাস আক্রান্তের সন্ধান মেলার পরই নড়েচড়ে বসে কেরালা প্রশাসন। ভারত তো বটেই, ব্রিটেন এবং আমেরিকার মতো দেশ পরের ২ মাস করোনা নিয়ে কোনও পদক্ষেপ করার কথা ভাবেনি। সেখানে জানুয়ারি মাস থেকেই কেরালার সমস্ত বিমানবন্দরে কড়া স্ক্রিনিং শুরু হয়। বিদেশ থেকে আসা সমস্ত যাত্রীদের গতিবিধি সম্পর্কে সবিস্তারে খোঁজ করা হয়। সামান্য উপসর্গ থাকলেই সেই যাত্রীকে সরকারি হাসপাতালে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়। সংগৃহীত নমুনা পরীক্ষার জন্য ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ ভাইরোলজিতে (NIV) পাঠানো হয়। ফেব্রুয়ারি মাসে সমস্ত বিষয়ের উপর নজর রাখতে 24 জনের একটি দল তৈরি করেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী কে কে শৈলজা। এই দলের প্রধান কাজ পুলিশ, হাসপাতাল এবং টেস্ট সেন্টারগুলির যাবতীয় তথ্য সংগ্রহ করা এবং প্রতিদিনের রিপোর্ট তৈরি করা।

     

    অনেকে প্রশ্ন করতে পারেন, কেরালা আগে থেকে এত প্রস্তুত ছিল কীভাবে? উত্তর লুকিয়ে রয়েছে রাজ্যে ভাইরাস আক্রান্ত হওয়ার ইতিহাসে। 2018 সালে নিপা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে 17 জনের মৃত্যু হয় কেরালায়তার আগে ইবোলাও থাবা বসিয়েছিল সে রাজ্যেচিকিৎসাহীন ভাইরাস সংক্রমণ নিয়ে কেরালায় বিশেষ মেডিক্যাল বোর্ডও গঠন করা হয় বহু আগে। তাই করোনা নিয়ে আগাম সতর্ক ছিল প্রশাসন। সে কারণেই বিদেশফেরত সমস্ত যাত্রীদের জিপিএস ট্র্যাকিং করে তাঁদের গতিবিধির যাবতীয় তথ্য সংগ্রহ করা হয়। মার্চ মাসের প্রথম সপ্তাহের মধ্যেই।

    11 মার্চ WHO করোনাকে বিশ্বমহামারী ঘোষণা করে। এক দিন পরেই দেশে প্রথম করোনা আক্রান্তের মৃত্যু হয়। তখনও সম্বিত ফেরেনি কেন্দ্রের। সেখানে মার্চের প্রথম সপ্তাহ থেকেই লকডাউনের পথে হাঁটে কেরালা। স্কুল, কলেজ বন্ধ করা হয়। বড় জমায়েতের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। সরকারি-বেসরকারি সমস্ত ক্ষেত্রে ওয়ার্ক ফ্রম হোমের নির্দেশ দেওয়া হয়। বাড়িতে ইন্টারনেট পরিষেবা যাতে ব্যাহত না হয় সে দিকেও নজর দেওয়া হয়। প্রতিদিন স্থানীয় সংবাদমাধ্যমে বিবৃতি দিতে শুরু করেন মুখ্যমন্ত্রী পিনারাই বিজয়ন। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের অবিলম্বে স্যানিটাইজার তৈরিতে জোর দিতে বলা হয়। রাজ্যজুড়ে 1 লক্ষ 34 হাজার মানুষকে আইসোলেশনে থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়। যার মধ্যে মাত্র 620 জনকে সরকারি হাসপাতালে রাখা হয়। তার সঙ্গে সমস্ত জেলায় স্বাস্থ্যকর্মীদের নিয়ে তৈরি করা হয় কলসেন্টার। যেখানে আইসোলেশনে থাকা প্রত্যেককে নিয়মিত ফোন করা হয়কেউ তথ্য গোপন করলে বা মিথ্যার আশ্রয় নিলে তৎক্ষণাৎ সেখানে পুলিশ পাঠিয়ে ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়। প্রত্যেক জেলাশাসকের দফতরে 15 সদস্যের দল গঠন করা হয়। এই দলটি জেলাভিত্তিক রিপোর্ট তৈরি করে স্বাস্থ্যমন্ত্রককে জানায়।

     

    করোনার চেইন ভাঙতে তৃণমূল স্তর থেকে প্রশাসনের সর্বোচ্চ স্তর পর্যন্ত সুদক্ষ মানুষদের নিয়ে একটি চেইন তৈরি করে দেওয়া হয়এই চেইনটাই করোনাকে বেঁধে ফেলে কেরালায়। আর এ গোটা বিষয়টাই তৈরি হয়ে যায় মার্চ মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহের মধ্যে। তখনও পর্যন্ত কেন্দ্রের তরফ থেকে কোনও নির্দেশিকা জারি করা হয়নি। না জনসমক্ষে এসে বিবৃতি দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। গোটা দেশ যখন থালা-বাটি বাজিয়ে রাস্তায় ঘুরে বেরিয়েছে, সে সময় নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তায় মুড়ে দেওয়া হয়েছে কেরালাকে। 24 মার্চ যখন প্রধানমন্ত্রী গোটা দেশে মাত্র 4 ঘণ্টার নোটিসে লকডাউন ঘোষণা করলেন, সে সময় কেরালাবাসী লকডাউনে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে। বাকি রাজ্যগুলিতে যেখানে লকডাউন মানতে অনেকের বেশ ‘অসুবিধা’ হয়েছে, সেখানে ঘর ছেড়ে কেউ বাইরে পা রাখেননি কেরালায়।

     

    21 মার্চ ICMR-এর রিপোর্ট বলছে, তখনও পর্যন্ত দেশে করোনা আক্রান্তের সংখ্যা ছিল 236যার মধ্যে মহারাষ্ট্রে আক্রান্তের সংখ্যা 52 এবং কেরালায় 28 মৃতের সংখ্যা ছিল 4 31 মার্চ গোটা দেশে করোনা আক্রান্তের সংখ্যা ছিল 1,637এর মধ্যে কেরালায় ছিল 215 জন। 15 এপ্রিলের হিসেব বলছে, গোটা দেশে আক্রান্তের সংখ্যা 11,487মৃতের সংখ্যা 393যার মধ্যে মহারাষ্ট্রে আক্রান্তের সংখ্যা 2,684মৃতের সংখ্যা 178সেখানে কেরালায় আক্রান্তের সংখ্যা 376 জন। মৃতের সংখ্যা 2এই পরিসংখ্যানই কেরালায় সামগ্রিক করোনা পরিস্থিতি বোঝার জন্য যথেষ্ট।

     

     

    প্রশাসনিক স্ট্র্যাটেজি

    মেডিক্যাল স্ক্রিনিং এবং স্বাস্থ্য পরিষেবা অবশ্যই প্রশাসনিক স্ট্র্যাটেজির অঙ্গ। কিন্তু পুলিশ এবং জেলা প্রশাসনকে যুদ্ধকালীন তৎপরতায় কাজে লাগাতে পেরেছে কেরালা। উদ্দেশ্যহীন ভাবে যাতে কেউ রাস্তায় না বার হন তার জন্য সিসিটিভি ফুটেজে 24 ঘণ্টা নজর রাখা হয়েছে। কোথাও এর অন্যথা দেখলেই ছুটে গিয়েছে পুলিশ। চিকিৎসক এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের অনুরোধ করা হয়, যাতে তাঁরা অতিরিক্ত শিফ্টে কাজ করেন। গোটা রাজ্যে সমস্ত হাসপাতালে অঘোষিত ভাবেই নিদেনপক্ষে 12 ঘণ্টার শিফ্টে নিরন্তর কাজ করে গিয়েছেন সমস্ত চিকিৎসক এবং কর্মীরা।

     

    দেশের প্রথম রাজ্য সরকার হিসাবে করোনার জন্য 2000 কোটি টাকার রিলিফ প্যাকেজ ঘোষণা করে কেরালা। প্রত্যেক জেলায় প্রয়োজন অনুযায়ী কমিউনিটি কিচেন গড়ে তোলা হয়। যে সমস্ত জেলায় ভিন্ রাজ্যের শ্রমিক বেশি থাকেন, সেখানে খাদ্য সরবরাহে অতিরিক্ত জোর দেওয়া হয়। সে জন্যই দেড় মাসের বেশি লকডাউন হয়ে গেলেও এখনও পর্যন্ত পরিযায়ী শ্রমিকদের কোনও জমায়েত দেখা যায়নি সেখানে। বয়স্ক এবং অসমর্থদের চিহ্নিত করে বাড়িতেই অত্যাবশ্যকীয় পণ্য পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। দারিদ্র সীমার নীচে থাকা পরিবারদের বিনামূল্যে চাল, ডাল, তেল ইত্যাদি সরবরাহ করা হয়। প্রশাসনের দিক থেকে এটা নিশ্চিত করা হয়, যাতে মরণ-বাঁচন সমস্যা ছাড়া কেউ রাস্তায় না বার হন।

     

    যেখানে রোগের কোনও ওষুধ নেই, সেখানে সংক্রমণ এবং মৃত্যু রোখার একমাত্র উপায় ঘরবন্দি হয়ে থাকা। এটাই রাজ্য সরকার বোঝাতে পেরেছিল সাধারণ মানুষকে। বাকি দেশের চেয়ে বহু আগেই।

     

    করোনা নিয়ন্ত্রণে রেখেও কেরালা সরকারের সামনে একটা চ্যালেঞ্জ থেকেই যাচ্ছে। বিশ্বজোড়া লকডাউন ওঠার পর বিভিন্ন দেশ থেকে, বিশেষত মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলি থেকে বহু শ্রমিক ফিরে আসবেন কেরালায়। সংখ্যা কয়েক লক্ষ পর্যন্ত হতে পারে। তখন স্ক্রিনিং করে নতুন করে সংক্রামিত ব্যক্তিদের চিহ্নিত করে তাঁদের চিকিৎসা এবং কোয়ারেন্টাইনে রাখাটা একটা বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে। ফলে ভবিষ্যতে নতুন করে সংক্রমণ ছাড়ানোর সম্ভাবনা একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

     

     

    শিক্ষা এবং শিক্ষিত

    কেরালায় সাক্ষরতার হার প্রায় 94%দেশের মধ্যে সবচেয়ে বেশি। স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন উঠতে পারে, করোনা মোকাবিলার সঙ্গে সাক্ষরতার হারের কী সম্পর্ক রয়েছে? A, B, C, D তো করোনাকে আছড়ে মারবে না? না, মারবে না। কিন্তু শিক্ষিত মানুষ প্রশাসনকে সাহায্য করবে এই মারণ রোগকে মারতেমহামারী ঠেকাতে সম্পূর্ণ ঘরবন্দি থাকতে হবে, এটা অক্ষরে অক্ষরে মেনে নতুন সংক্রমণের হার প্রায় শূন্যতে নামিয়ে আনতে সাহায্য করবে শিক্ষা। বিদেশ ভ্রমণের যাবতীয় তথ্য সরকারের কাছে দিয়ে মেডিক্যাল স্ক্রিনিংয়ে সম্পূর্ণ সহযোগিতা করবেন শিক্ষিত মানুষ। পশ্চিমবঙ্গে যেখানে আমলাপুত্র ক্ষমতার অলিন্দে নিশ্চিন্তে বাবা-মায়ের হাত ধরে ঘুরে বেড়াতে পেরেছে, কেরালায় পারেনি। তা তিনি আমলা হোন, বা বেসরকারি চাকুরে। বিদেশে কর্মরত শ্রমিক হোন বা ধনী বিদেশি পর্যটক। ব্রিটেনের এক পর্যটক সংক্রমণ লুকিয়ে বিমানে চেপেছিলেন ঠিকই, কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি। বিমান তিরুবনন্তপুরম বিমানবন্দরে ফিরিয়ে এনে সমস্ত যাত্রীদের মেডিক্যাল স্ক্রিনিং করানো হয়েছিল।

     

    দেশের বেশ কিছু জায়গায়, এমনকী কলকাতায় পর্যন্ত জনে জনে ডেকে গোমূত্র খাওয়ানো হয়েছিল করোনার ওষুধ হিসাবে। হোয়াটসঅ্যাপ ইউনিভার্সিটির অধ্যাপকরা একের পর এক করোনা নিধনের থিসিস ছড়াতে ব্যস্ত ছিল। সে সময় কেরালায় অঘোষিত জরুরি অবস্থা চলছিল। ঘরবন্দি মানুষজন মারণ ব্যাধিকে ঠেকাতে একজোটে যুদ্ধ শুরু করেছিলেন। লকডাউনের মাঝেও দেশে অকাল দিওয়ালি, আতসবাজি পুড়িয়ে, গো করোনা গো (গো মানে গরু নয়) স্লোগান দিয়ে মহামারী একপ্রকার সেলিব্রেট করেছে। এর স্বপক্ষে নানা যুক্তিও খাড়া করেছে বহু মানুষ। সোশাল মিডিয়ায় সমালোচনা করলে মারার হুমকি পর্যন্ত দেওয়া হয়েছে। বা নিদেনপক্ষে পাকিস্তানে পাঠানোর হুমকি তো অহরহ দেওয়া হয়েছে। সেখানে নিষ্প্রদীপ থেকেই করোনায় মৃতদের আত্মার শান্তি কামনা করেছেন কেরালাবাসী

     

    শেষ করার আগে লেখার প্রথম দু’টি অনুচ্ছেদে একবার ফিরতেই হবে। ভূমিকাটি এটাই বোঝানোর জন্য লেখা হয়েছিল, যাতে কেরালাবাসী সম্পর্কে একটা পরিষ্কার ধারণা হয় সকলের। আসলে করোনা ঠেকানোটা একটা উদাহরণ মাত্র। করোনার বদলে অন্য কোনও মহামারী হলেও কেরালায় একই চিত্র দেখা যেত। যেখানে রাজ্যের মানুষ প্রকাশ্যে গলা তুলে কথাও বলেন না, সেখানে শিক্ষা বার বার জিতে যায়। কেরালার রাজ্য সরকার এ ক্ষেত্রে বেশ ভাগ্যবান, কারণ সে রাজ্যে হোয়াটসঅ্যাপ ইউনিভার্সিটিতে পড়া ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা নেই বললেই চলে। না হলে করোনার রক্তবমির থিওরি, সূর্যালোকে করোনামুক্তি, গোমূত্র করোনার শ্রেষ্ঠ ওষুধ ইত্যাদি নিয়ে বিস্তর তর্কবিতর্ক হতো। গোমূত্র পার্টি, কেন্দ্রের শাসকদলের কোনও নেতা বা পার্টিরই জন্মদিনে জমিয়ে মোচ্ছব হতো। জামাতের জমায়েত হতো। কিন্তু করোনাকে ঠেকানো যেত না। এখানেই বিরাট ভূমিকা নিয়েছে শিক্ষা।

     

    আসলে শিক্ষার অভাব এবং শিক্ষিত হয়েও পরিস্থিতির গুরুত্ব না বোঝা দু’টোই ভয়ংকর ক্ষতিকারক। সেটা এখন ইউরোপ, আমেরিকা এবং ভারতীয় উপমহাদেশকে দেখে ভালোই বোঝা যাচ্ছে। এখানেই একেবারে অন্য আসনে কেরালা, শিক্ষিত কেরালা।

     

     

    তথ্যসূত্র:

    ----------------------------------

    1. MIT TTechnology Review

    2. The Economic Times

    3. Live Mint

    4. India Today

    5. Financial Express

     


    রজত কর্মকার - এর অন্যান্য লেখা


    এখানে নেতারা শুধু ভিভিআইপি নন, তাঁরা একাধারে বিজ্ঞানী, চিকিৎসক, ইতিহাসবিদ ইত্যাদি ইত্যাদি।

    এমনিতেই মোদীবাবুর গুণের শেষ নেই। এত গুণের সঙ্গে তিনি কি ভবিষ্যৎদ্রষ্টাও?

    তা হিন্দু মহাসভা তো চিনে ফেলেছে। আপনারা সব চিনেছেন তো? মড়ক তাদের আরাধ্য দেবতা। পুজো হবে লাড্ডু আসবে

    পাপ-পুণ্যের পরিভাষা বুঝতে গোটা জীবন কেটে যায়। এ কথাটি সম্যকভাবে বোঝার জন্য সিনেমাটি একবার অন্তত দেখব

    সিনেমাটি আদ্যন্ত হাসির মোড়কে প্রস্তুত করা হলেও গল্পের গরুকে চাঁদে না পাঠালেও চলত।

    খেলাধুলো করলে বড় হয়ে একটি শিশু কী হবে, আদৌ গাড়িঘোড়া চড়বে কিনা তা নিয়ে স্পষ্ট করে কোনও প্রবাদ বা

    কেরালায় কনট্রোলে করোনা: ম্যাজিক নয়, শুধু স্ট্র্যাটেজি আর শিক্ষা-4thpillars