×
  • নজরে
  • ছবি
  • ভিডিও
  • আমরা

  • বাংলাকে বড় হতে দেয়নি দিল্লিই

    উদয়ন নাম্বুদিরি | 16-08-2022

    বাংলাকে বড় হতে দেয়নি দিল্লিই

    প্রায় সকলেই জানেন যে স্বাধীনতার সময়ে পশ্চিমবঙ্গের অর্থনৈতিক অবস্থা ছিল ভারত তথা দক্ষিণ এশিয়ায় সবচেয়ে উন্নত। 1965 সালেও পশ্চিমবঙ্গের Industrial output সমগ্র দেশের এক চতুর্থাংশ। তারপর শুরু হল উল্টোরথের যাত্রা, যার রশি ছিল উগ্র শ্রমিক আন্দোলনকারী এবং অপদার্থ রাজনৈতিক নেতাদের হাতে। দেখতে দেখতে পশ্চিমবঙ্গ 2018-19 সালে ভারতের 29টি বড় রাজ্যের মধ্যে 21তম স্থানে নেমে এল।

    উপরি উক্ত সবকয়টি তথ্যই ভুল।

    পশ্চিমবহ্গের অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ কোনও দিনই ঠিকভাবে করা হয়নি। 1947 সালের পশ্চিমবঙ্গ মোটেই আজকের পশ্চিমবঙ্গ ছিল না। সেটি ছিল একটি খাতায় কলমে পরিসংখ্যান মাত্র, আর আজকের পশ্চিমবঙ্গ হল স্বাধীনতার 75 বছর পার করা একটি বাস্তবতা। খাতায় কলমে পরিসংখ্যান বলার কারণ হল 1947-এ আমরা নিজেদের বিভক্ত বাংলার প্রকাণ্ড এবং ব্রিটি অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান শিল্প পরিকাঠামোর উত্তরাধিকারী বলে মনে করতাম। সেই বিস্তৃত পরিকাঠামোর পতন অনিবার্য হয়ে পড়ল দেশভাগের কারণে। পরবর্তী বিশ-বাইশ বছরের মধ্যেই পশ্চিমবঙ্গ প্রম থেকে নেমে এল পঞ্চম স্থানে। 1980 সালে তার স্থান ছিল সপ্তমে।

    প্রথমই বলে নেওয়া দরকার, কলকাতা কেন্দ্রিক বঙ্গীয় শিল্প এবং শিল্প-সংশ্লিষ্ট পরিষেবা পশ্চিমবঙ্গ অকট নবগঠিত রাজ্য হিসাবে পেলেও সেই কর্মকাণ্ডের ভিত্তি ছিল পূর্ব বাংলায় – যা কিনা দেশভাগের ফলে পাকিস্তানে চলে গিয়েছে তখন। পাট শিল্পের উপমাটা বিখ্যাত। প্রায় সব পাটকল পড়ল পশ্চিমবঙ্গে, আর পাট উৎপাদনের জমি পড়ল পাকিস্তানে। ফলে 1949 সাল থেকেই পাটকলগিলিকে তাদের কাঁচা মাল কিনতে হত ডলার দিয়ে।

    স্বাধীনতার পর পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কর্ণধাররা ভারতের অর্থনৈতিক মূল স্রোতের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গকে স্থান পাইয়ে দিতে বেশি উদ্যোগী হয়েছিলেন। অথচ তাঁদের করা উচিত ছিল উল্টোটা। পশ্চিমবঙ্গ তখন ভারতীয় শিল্প-বাণিজ্যের মধ্যমণি, সব ধরনের শিক্ষিত মেধাবী মানষকে আকৃষ্ট করার ক্ষমতা তার ছিল। সেটাকে কাজে লাগিয়ে যদি এই রাজ্যের শীর্ষস্থানীয় ভদ্রমণ্ডলী তাঁদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বল প্রয়োগ করে ভারতীয় মল স্রোতে সামিল হওয়ার পরিবর্তে বঙ্গীয় মূল স্রোতকে শক্তিশালী করার চেষ্টা করতেন, তবে পশ্চিমবঙ্গের আজ এই অবস্থা হত না।

    কীভাবে পশ্চিমবঙ্গ তার ঐতিহাসিক শীর্ষ স্থান হারাল তার উত্তরটি লুকিয়ে আছে সেই যুগের সাম্প্রদায়িক রাজনীতির মধ্যে। দেশ ভাগের কিছু দেনের মধ্যেই কলকাতা ও ঢাকায় কিছু বাণিজ্য মহলের টনক নড়ল। তাঁরা বুঝতে পারলেন, বড় ভুল হয়ে গিয়েছে, হিন্দু-মুসলিম বিভাজনটা নিয়ে বড্ড বেশি বাড়াবাড়ি করে ছেলেছেন দুই দেশের নেতারাই। এর অর্থনৈতিক প্রভাবটা হবে অতি ভয়াবহ। পশ্চিমবঙ্গ তো তার শীর্ষ স্থান হারাবেই, পূর্ব বঙ্গও (পূর্ব পাকিস্তান) চলে যাবে অর্থনীতির গভীর অন্ধকারে।

    এই চিন্তা নিয়ে এই চিন্তা নিয়ে ফজলুল হক, সুরাবর্দী এবং পশ্চিমবঙ্গের কংগ্রেস নেতাদের একাংশ পরস্পরের মধ্যে আলোচনা শুরু করলেন। শরৎচন্দ্র বসু, কিরণ শঙ্কর রায়, প্রফুল্ল ঘোষ সহ বেশ কিছু কংগ্রেস নেতার প্রস্তাব ছিল শীগ্রই যেন এক অভিভক্ত বাংলা মু্ক্ত বাণিজ্য অঞ্চল বা Free trade zone গঠন করা হয়, যাতে যুগ যুগ ধরে গড়ে ওঠা অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক ব্যবস্থাগুলি হঠাৎ অকেজো না হয়ে যায়। তার সঙ্গে এই প্রস্তাবও উঠেছিল যে ধর্ম, জাত ইত্যাদি নির্বিশেষে সীমান্তের দু পারেই সমস্ত বাঙালি যেন পাসপোর্ট ছাড়া অন্য পারে যাতায়াত এবং কাজকর্ম করতে পারে।

    কিন্তু দুঃখের বিষয় এই যে অতি বাস্তবসম্মত এই প্রস্তাবকে একটি অসম্ভব পরিকল্পনা বলে উড়িয়ে দেওয়া হল। এই প্রস্তাবের প্রয়োজনীয়তা বা কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন করার িছু ছিল না। কিন্তু প্রতিরোধটা অল অন্য মহল থেকে। পশ্চিমবঙ্গের শিল্প-বাণিজ্যের নিয়ন্ত্রণের রাশ তত দিনে ব্রিটিশ এবং অ্যাংলো ইন্ডিয়ানদের হাত থেকে চলে গিয়েছে মারোয়াড়িদের হাতে। ওই সব শিল্পপতিদের পশ্চিমবঙ্গের প্রতি কোনও দায়বদ্ধতা ছিল না। বরং তাঁরা ছিলেন দিল্লিতে প্রবল প্রভাবশালী। মহাত্মা গান্ধী তেকে শুরু করে নেহর, প্যাটেল প্রমুখ নেতাদের তাঁরা বোঝাতেন যে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে ওই ধরনের দুই দেশ জুড়ে স্বায়ত্তশাসনের মতো ব্যবস্থা ভবিষ্যতে হিন্দুস্তানের জন্য একটি নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষার সমস্যা বা security threat হয়ে দাঁড়াবে।

    তা ছাড়া কংগ্রেস পার্টি তখন দেশের সব প্রান্তে সবচেয়ে প্রবাবশালী রাজনৈতিক শক্তি। পশ্চিমবঙ্গের কংগ্রেস নেতারা দিল্লিস্থ হাইকমান্ডের কথায় ওঠেন আর বসেন। সেই দিল্লি আবার নবগঠিত পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের সমস্ত ব্যপারে মারোয়াড়ি ব্যবসায়ীদেরই পরামর্শ নিত। নতুন রাজ্যের প্রথম Premier প্রফুল্ল ঘোষ যখন বিড়লা গোষ্ঠীর দুর্নীতির বিরুদ্ধে পদক্ষেপ করলেন, তখন তাঁকে পাঁচ মাসের মধ্যে সরিয়ে দিয়ে নেহরু বিধানচন্দ্র রায়কে সেই পদে নিয়ে এলেন। পরে 1951 সালে নির্বাচনের পর সেই বাধান রায় রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হয়ে গেলেন।

    কিন্তু দেশভাগের স্থায়ী ক্ষতি দুই বাংলার অর্থনীতিতেই হয়ে গেল। স্বাধীন ভারতের অর্থনীতিতে বাংলা, বিশেষ করে পস্চিবঙ্গ উজ্জ্বলতম রত্ন হতে পারত। তা হল না দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের দ্বারা চালিত সঙ্কীর্ণমনা রাজনীতিকদের জন্য।

    #AzadikaAmritMahotsav #Bengal_Economy #PartitionOfBengal


    উদয়ন নাম্বুদিরি - এর অন্যান্য লেখা


    স্বাধীনতার পর দুই বাংলা নিয়ে মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চলে লাভবান হত সকলেই

    একুশের সত্তর পূর্তিতে ভাষা শহীদ ভাইদের এবং তাঁদের দ্বারা অনুপ্রাণিত সারা বিশ্বের ভাষা আন্দোলনের শহীদ

    গৈরিক জেনারেল হয়ে নেতাজির দিল্লি-জয়!

    বাংলাকে বড় হতে দেয়নি দিল্লিই-4thpillars

    Subscribe to our notification

    Click to Send Notification button to get the latest news, updates (No email required).

    Not Interested