Support 4thPillars

×
  • আমরা
  • নজরে
  • ছবি
  • ভিডিও

  • দু'পয়সার অহংকার

    বিতান ঘোষ, দু'পয়সার প্রেসের এক ছোটখাটো সদস্য | 11-12-2020

    এরকম ছবি দিয়েই আজকাল দেশের সংবাদমাধ্যমের ভূমিকা বোঝানো হচ্ছে!

    শ্রেণীস্বার্থে ঘা পড়লে শ্রেণীচেতনা জাগবেই, সে আপনি মার্ক্স পড়ুন বা না পড়ুন। মাত্র দু'পয়সায় খরিদ হওয়ার পরও কিছু সময় মৌনব্রত পালন করেছিলাম। কিন্তু একজন অকিঞ্চিৎকর সংবাদকর্মী হিসাবে বেশিক্ষণ হিরন্ময় নীরবতা নিয়ে বসে থাকা গেল না। অসির চেয়ে মসীর জোর বেশি, এই আপ্তবাক্যকে স্মরণে রেখেই কলম দিয়ে সেই জনপ্রতিনিধির ঔদ্ধত্যে আঘাত হানার চেষ্টা করলাম।

    গঙ্গার ধারে বড় হয়ে ওঠার সুবাদে গঙ্গাপাড়ে অনেক শূকরের আনাগোনা লক্ষ্য করতাম। পাঁক মাখা সেই চতুষ্পদগুলিকে দেখে ঘেন্নাই করত। পরে অরওয়েলের অ্যানিমাল ফার্ম পড়ে সেই প্রতীকী শূকরের মুখে যখন শুনলাম, "all animals are equal. But some animals are more equal than others," তখন যেন বিন্দুতে সিন্ধুদর্শন হল। শূকর প্রজাতিটি আমার কাছে বেশ সম্ভ্রমের জায়গা দখল করে নিল। তারপর যখন সংবাদকর্মী হিসাবে কর্মজীবনে প্রবেশ করলাম, দেখলাম একটা ব্যঙ্গচিত্রে প্রতীকী শূকরের স্তনে মুখ দিয়ে আছে কিছু নাবালক শূকর আর সেই শূকরগুলির গায়ে বিভিন্ন মিডিয়া হাউসের নাম লেখা। আর বড় শূকরটির গায়ে লেখা কর্পোরেটস। নিচে ছোট করে লেখা প্রেস্টিটিউটসনতুন শোনা ইংরেজি শব্দটির অপভ্রংশ করে বুঝলাম, সংবাদকর্মী এবং সংবাদমাধ্যমকে যৌনকর্মীদের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। ইঙ্গিতটা হল, সংবাদমাধ্যম পয়সা নিয়ে নিজেদের বিক্রি করে দেয়। যৌনকর্মী শরীর বেচে, আর সাংবাদিক কলম। তুলনীয় পেশাটার প্রতি আমার কোনও তাচ্ছিল্য বা রাগ ছিল না, কিন্তু সাংবাদিক মানেই বিক্রিত আর বিকৃত— বক্তব্যের এই নির্যাসে আহত হয়েছিলাম।

    জীবনে অতটা হতাশ আর কবে হয়েছি মনে পড়ে না। যে পেশাকে ভালবেসে, যে কলমকে মহার্ঘ্য ভেবে সাংবাদিকতা জীবনে প্রবেশ করতে চলেছি, সেই পেশাকেই অত্যন্ত ঘৃণা আর অসম্মানের একটা পেশা বলে মনে হচ্ছিল। জীবনে গ্রাসাচ্ছাদনের জন্য কিছু অর্থের প্রয়োজন হয় ঠিকই, কিন্তু অর্থের হিসেবনিকেশ করে সংবাদকর্মীর কলম চলে না। আমি অন্তত নিজের স্বল্প অভিজ্ঞতায় তা দেখিনি। কী ভাগ্যিস! সাংবাদিকের কলম বিস্তৃত, দেশ থেকে দেশান্তরে, এক দৃষ্টিকোণ থেকে অন্য দৃষ্টিকোণে। শাসক বিচ্যুত হলে, বিরোধী দিশাহীন হলে একজন সংবাদকর্মীকেই তাদের দায়দায়িত্ব স্মরণ করিয়ে দিতে হয়। যা নির্মম সত্য, তা শুনতে বা পড়তে কখনও সুমিষ্ট হয় নাকিন্তু প্রয়োজনে সেই তেঁতো পাঁচন পরিবেশন করারও দায়িত্বও নিতে হয় সাংবাদিককে। এমন বহুক্ষেত্রে সাংবাদিকের দু'টো পয়সা তো জোটেই না, উল্টে বাছা বাছা বিশেষণকে উপহার হিসাবে পেয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হয়।

    লোকসভার মাননীয় এই সাংসদ কিছুদিন আগেই সংসদে মার্কিন সাংবাদিক, প্রাবন্ধিক মার্টিন লংম্যানকে উদ্ধৃত করে দেশে ফ্যাসিবাদের লক্ষণ স্পষ্ট হয়ে উঠছে বলে সতর্ক করেছিলেন। আজকের ভারতবর্ষে গণতন্ত্রের চারটি স্তম্ভ কতখানি নড়বড়ে হয়ে গিয়েছে তার অনুপুঙ্খ বর্ণনা দিয়েছিলেন সেই সাংসদ। সংবাদমাধ্যম আগাগোড়া তাঁর সেই বক্তব্যকে ছড়িয়ে দিয়েছিল দিকে দিকে। সেই বক্তব্যে গণতন্ত্রের চারটি স্তম্ভকে শক্তিশালী করার প্রয়োজনীয়তার দিকটি তুলে ধরেছিলেন তিনি। এরপরেও গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভ সম্পর্কে এতটা হীন মন্তব্য তিনি করলেন কী ভাবে? সংসদের মিনিটস-এ ভবিষ্যতেও রয়ে যাবে তাঁর সেই বক্তব্য, তিনি বিস্মৃত হয়ে গেলে তাঁকে পুনর্বার সে কথা স্মরণ করিয়ে দিতে হবে।

    চতুর্থ স্তম্ভের ওপর আঘাত তো নতুন কিছু নয়। এর আগে জরুরি অবস্থার সময়ে বহু কৃতী সাংবাদিককে কয়েদজীবন অতিবাহিত করতে হয়েছে। বরাবরই দর্পী শাসকের চক্ষুশূল হয়েছে গণমাধ্যম। সরকারি চাকরির নিশ্চিন্ত আশ্রয় ত্যাগ করে অনেকেই সাংবাদিকতার ঝঞ্জাবিক্ষুব্ধ দরিয়ায় ঝাঁপ দিয়েছেন, সম্পূর্ণ স্বেচ্ছায়। সাংবাদিক খবর করেছেন অকাল তখত্-এ ভিন্দ্রানওয়ালের দুর্গের ভিতর থেকে, এলটিটিই প্রধান প্রভাকরণের গোপন ডেরার ভিতরে পৌঁছে, সশস্ত্র ধর্মোন্মাদ যুবকদের হুমকিকে উপেক্ষা করে বাবরি ভেঙে ফেলার দৃশ্য এবং ঘটনাক্রম নিউজপ্রিন্টে ফুটিয়ে তুলেছেন সাংবাদিক। মাননীয় সাংসদ, আপনি এই ত্যাগ, এই নিষ্ঠাকে কাঞ্চনমূল্যে মাপার ধৃষ্টতা দেখাবেন?

    হ্যাঁ, অকপটে স্বীকার করে নেওয়া ভাল এ দেশের গণমাধ্যম তার সার্বিক দায়িত্ব অনেক সময়েই যথার্থ ভাবে পালন করতে পারছে না। ক্ষমতাসীনের সামনে হিজ মাস্টার্স ভয়েস’-এর পোষ্যটির মতোই ন্যুব্জ হয়ে যাচ্ছে চতুর্থ স্তম্ভ। জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার কোনও প্রতিফলন মূলস্রোতের সংবাদমাধ্যমে আসছে না। তাই সাধারণ মানুষও গণমাধ্যমকে সন্দেহের চোখে দেখছে। যা একসময় ছিল সাধারণের সহায়, তাই এখন অ-সাধারণদের হাতযশে সাধারণের বিরুদ্ধে যাচ্ছে। যার স্বীকৃতি মিলেছে বিশ্বে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা শীর্ষক ক্রমতালিকায়। সেই তালিকার একদম পিছনের দিকে ঠাঁই পেয়েছে আমাদের দেশের সংবাদমাধ্যম। এ গ্লানি আমাদের সকলের, কারও একার নয়। কিন্তু ছাইয়ের গাদা থেকেও কিন্তু আশার ফিনিক্স পাখি উড়ছে। কাশ্মীরে ছড়রা বুলেটের সামনে অকুতোভয়ে খবর সংগ্রহ করছেন তরুণ সাংবাদিক। গৌরী লঙ্কেশ, কিশোর দাভেরা তাঁদের রক্ত দিয়ে সেই নির্ভীকতার আখ্যান লিখে গেছেন।

    মাননীয় সাংসদ, সংসদে আপনার অনেক সতীর্থও কিন্তু দেশের আধা ফ্যাসিবাদী আগ্রাসনের বিরুদ্ধে ততটা সরব হননি, যতটা আপনি হয়েছিলেন। আবার সেই শূকরগুলোকে এখানে একটু ফিরিয়ে আনি। টিপিক্যাল পুরনো বামপন্থীদের মতো গোটা সংসদকে এই অজুহাতে শূকরের খোঁয়াড়বললে, আপনার মতো সাংসদদের পরিশ্রম, বিবেক, নিষ্ঠাকে অস্বীকার করা হবে। এক্ষেত্রে আমার মতো অনেকেই নৈরাশ্যের সিন্ধু মাঝে আশার বিন্দু খোঁজার পক্ষপাতী। এই আকালে আপনিও একটু স্বপ্ন দেখুন না। দেখুন না কেমন দুর্দমনীয় ইচ্ছাশক্তি নিয়ে কিছু ছেলেমেয়ে নিজেদের কাঁধে দেশের চতুর্থ স্তম্ভের ভার তুলে নিয়েছে। তাদের মনোবলকে আপনি ভেঙে দেবেন কোন স্পর্ধায়? তাদের নিষ্ঠা, ত্যাগ, সততাকে কাঞ্চনমূল্যে মাপার ক্ষমতা কিংবা সাধ্য আপনার নেই। দু'পয়সা ছুঁয়ে ঘোষণা করছি, কলম বিক্রি নেই। মাননীয়া, আপনার বক্তব্যের প্রত্যুত্তরে এটা কোনও স্বগতোক্তি নয়, স্পর্ধিত উচ্চারণ।

     


    দু'পয়সার অহংকার-4thpillars