Support 4thPillars

×
  • আমরা
  • নজরে
  • ছবি
  • ভিডিও

  • ষষ্ঠীতলায় এল বান

    শ্রবসী বসু | 11-08-2020

    ঊনবিংশ শতাব্দীতে বাংলাদেশে একটা চিন্তার ঢেউ উঠল যাকে বলা যেতে পারে Romantic Nationalism— রোমান্টিক জাতীয়তাবাদ। "রোমান্টিক' শব্দটির বাংলা প্রতিশব্দ পাওয়া না গেলেও, কল্পনাবিলাসী বা ভাববিলাসী কথাটা মোটামুটি খাপ খেয়ে যাবে। বিদেশী সাহিত্যে ক্লাসিক বা বাস্তবধর্মী ভাবনার বিপরীতে রোমান্টিসিস্‌ম্‌কে রাখা হয়। ভাববিলাসী জাতীয়তাবাদ বলতে কী বুঝব আমরা? বাংলা ছড়ার সঙ্গেই বা তার কী সম্পর্ক?

     

    ঊনবিংশ শতাব্দীর কলকাতা শহরের চেহারাটা একবার দেখে নেওয়া যাক। 1817 সালে হিন্দু কলেজ তৈরি হয়েছে children of the members of the Hindu Community-কে liberal education দেওয়ার উদ্দেশ্যে। 1826 সালে সতেরো বছর বয়সী ডিরোজিও এলেন সেখানে পড়াতে। মাত্র 5 বছরের মধ্যে তিনি তরুণ বাঙালীদের মধ্যে স্বাধীন চিন্তাভাবনার যে আগুন জ্বালিয়ে দিয়ে গেলেন, তা সূচনা করল এক নতুন আন্দোলনের যাকে ভবিষ্যতে নাম দেওয়া হবে বাংলার নবজাগরণ। বিদেশী ভাষা ও বিদেশী শিক্ষার মাধ্যমে ইউরোপীয় তত্ত্বচিন্তার নতুন হাওয়া এল কলকাতায়। ডিরোজিওর অনুপ্রেরণায় উচ্চবর্ণের ও উচ্চশিক্ষিত কয়েকজন বাঙালী খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করলেন। তখন ব্রাহ্মধর্মের সদ্য সূচনা হয়েছে (1828), ব্রাহ্মদের সমাজ-সংস্কার বা স্ত্রী-শিক্ষার আন্দোলন তখনও দানা বাঁধেনি। রামমোহনের নামে ছড়া লোকের মুখে মুখে ফিরছে

     

    সুরাই মেলের কুল

    বেটার বাড়ি খানাকুল

    বেটা সব্বনাশের মূল

    ওঁ তৎসৎ বলে বেটা বানিয়েছে ইস্কুল

    ও সে জাতের দফা করলে রফা মজালে তিন কুল

     

    এদেশে ইংরেজি শিক্ষার প্রচলন হয়েছিল ব্রিটিশ পার্লামেন্টে বাক্‌বিতণ্ডার মাধ্যমে। লর্ড বেন্টিঙ্কের আমলে English Education Act (1835) পাশ হয়। তখন সিদ্ধান্ত হয় যে ভারতবর্ষে ইংরেজি শিক্ষার জন্যই অর্থ বরাদ্দ হবে, সংস্কৃত বা আরবি বা ঐরকম কোনও দেশী ভাষার শিক্ষার জন্য নয়। ম্যাকলে বলছেন,

    “ ..... we are free to employ our funds as we choose; that we ought to employ them in teaching what is best worth knowing; that English is better worth knowing than Sanskrit or Arabic...  it is possible to make natives of this country thoroughly good English scholars, and that to this end our efforts ought to be directed. .....I have conversed both here and at home with men distinguished by their proficiency in the Eastern tongues. ....I have never found one among them who could deny that a single shelf of a good European library was worth the whole native literature of India and Arabia. Honours might be roughly even in works of the imagination, such as poetry, but when we pass from works of imagination to works in which facts are recorded, and general principles investigated, the superiority of the Europeans becomes absolutely immeasurable. ...it is impossible for us, with our limited means, to attempt to educate the body of the people. We must at present do our best to form a class who may be interpreters between us and the millions whom we govern; a class of persons, Indian in blood and colour, but English in taste, in opinions, in morals, and in intellect”.

     

    বিদেশী শিক্ষার হাওয়া কলকাতা শহরের উচ্চবর্ণ ও উচ্চবিত্ত হিন্দু ও ব্রাহ্মদের মনের সমস্ত সংস্কার একেবারে সমূলে উৎপাটিত করে না ফেললেও, অনেক বদল আনছিল বটে! শিক্ষা জিনিসটা জলের মত, একবার গড়াতে শুরু করলে তাকে থামিয়ে রাখা দায়। বাঙালিদের সামনে নানা দরজা খুলে যেতে লাগল, গ্রিক-ল্যাটিন সাহিত্যের সঙ্গে যেমন তাদের পরিচয় ঘটল, তেমনই ইউরোপের বিভিন্ন দেশের লোকসাহিত্য সম্বন্ধেও তাদের ঔৎসুক্য জেগে উঠল। 1867 সালে নবগোপাল মিত্র শুরু করলেন হিন্দুমেলা, যার প্রধান উদ্দেশ্য ছিল কলকাতা শহরের ইংরেজি শিক্ষিত সমাজের সামনে গ্রামীন শিল্পসামগ্রীর প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করা। একটা কথা এই প্রসঙ্গে মনে করা যেতে পারে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই এই ইংরেজি শিক্ষিতরা কিন্তু ছিলেন জমিদারীর অংশভাগী, অর্থাৎ গ্রামের সঙ্গে সম্পর্ক তাঁদের থাকার কথা, কারণ তাঁদের সংসারযাত্রা এবং আনুসঙ্গিক ব্যয়ের টাকা আসছে সেখান থেকেই। অথচ গ্রামের লোকশিল্পসামগ্রীর প্রদর্শনী করতে হচ্ছে কলকাতায়!

     

    সমসময়ে ম্যাক্স মূলার কেমব্রিজে ভাষণ দিলেন— তাঁর সেই বিখ্যাত সাতটি বক্তৃতার মালা যেখানে তিনি সংস্কৃত সাহিত্য, ভাষা এবং বৈদিক দর্শনের ভূয়সী প্রশংসা করেন। সব মিলিয়ে এই প্রথম কলকাতার গ্রাম-সম্পর্ক-বিচ্ছিন্ন উচ্চবর্ণ উচ্চবিত্ত শিক্ষিত অভিজাত বিদ্বজ্জন গ্রাম বিষয়ে উৎসুক হয়ে উঠলেন। পুরনো দিনের প্রতি একটা কৌতূহল, একটা আকর্ষণ, একটা ভাল লাগা, একটা কিছু পেয়ে হারানোর নস্টালজিয়া তৈরি হল। নস্টালজিয়া মানুষকে মোহিত করে রাখে, তার মোহমুক্তি ঘটায় না। এই মোহদৃষ্টিই পড়ল বাংলার লোকসাহিত্যের প্রতি।

     

    বাংলা লোকসাহিত্যের একটা প্রধান অংশ ছড়া। ব্রিটিশরা অনেক বিষয়েই পথপ্রদর্শক, তার মধ্যে বাংলা লোকসাহিত্য সংকলনও রয়েছে। কিন্তু ছড়ার প্রতি কলকাতার ভদ্রজনের দৃষ্টি আকর্ষণ করলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। সম্ভবত 1890-91 সালে শিলাইদহে বসবাসকালে রবীন্দ্রনাথ ছড়া সংগ্রহ করতে শুরু করেন। তিনি ছড়া সম্বন্ধে সুদীর্ঘ আলোচনা করেছিলেন 1894 সালে পঠিত ‘মেয়েলি ছড়া’ প্রবন্ধে। তখন বিদ্বজ্জনসমাজে মেয়েলি গ্রাম্য সাহিত্য বিষয়ে উন্নাসিকতা প্রবল। রবীন্দ্রবাবু যে দেশপ্রচলিত কতকগুলি ছেলেভুলানো ছড়া সংগ্রহ করিয়া দেশে কুরুচিভাবের নিদর্শন প্রদর্শন করিয়াছেন, ছড়াগুলি যে অধিকাংশই নীরস, অনর্থক ও উদ্দেশ্যশূন্য — এমন সমালোচনা তত্ত্ববোধিনী পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল।

     

    সেই একই সময়ে অবনীন্দ্রনাথ লেখেন ক্ষীরের পুতুল (1896)রবীন্দ্রনাথ লিখিয়েছিলেন, ছোটদের উপযোগী বই। সেই বইতে অবনীন্দ্রনাথ ব্যবহার করলেন ছড়ার পর ছড়া। অবনীন্দ্রনাথ নিজেই বলেছেন ক্ষীরের পুতুলের গল্প নাকি তিনি রবি-পত্নী মৃণালিনী দেবীর খাতা থেকে নিয়েছিলেন। ক্ষীরের পুতুল তো শুধু রূপকথার গল্প নয়, অবনীন্দ্রনাথের অননুকরণীয় ভাষার শৈল্পিক বুনটে রূপকথা, ছড়া, ব্রতকথা, লৌকিক দেবী সব একসঙ্গে মিশে গেছে।

     

    গল্পের প্রথমে রাজা চললেন দেশবিদেশ বেড়াতে। নিয়ে আসলেন দেবকন্যার হতে বোনা, নাগকন্যার হাতে গাঁথা মায়ারাজ্যের মায়াশাড়ি, মায়া গহনা। আর তার সঙ্গে গল্পের মধ্যে ঢুকে পড়ল এক বাঁদর। তারপর তো সেই ক্ষীরের ছেলেকে বিয়ে দিতে নিয়ে যাওয়া, আর ফন্দি করে মা ষষ্ঠীকে দিয়ে ক্ষীরের পুতুল খাইয়ে দেওয়া। ব্যস্ আর কোথায় যাবে? বাঁদর এসে বলে “ঠাকরুণ, পালাও কোথা, আগে ক্ষীরের ছেলে দিয়ে যাও”। ষষ্ঠী ঠাকরুণ বাঁদরকে দিব্যদৃষ্টি দিলেন। বাঁদর দেখল ষষ্ঠীতলা ছেলের রাজ্য, আর আমরা দেখলাম তা ছেলেভুলানো ছড়ার রাজ্যও বটে।

     

    ষষ্ঠীতলা থেকে কমলাপুলির দেশ ঘুরে বাঁদর এসে পৌঁছোল শিবঠাকুরের বিয়ে করা সেই তিনকন্যার এক কন্যা, যিনি বাপের বাড়ি গেলেন, তাঁর সঙ্গে বাপের বাড়ির দেশে। তার আগে দেখা হল

     

    বনগাঁ-বাসি মাসি-পিসি বনের ধারে ঘর।

    কখনো মাসি বলে না যে খৈ-মোয়াটা ধর।।

    সে সব হল হপ্তমালার দেশ।

    পুটুরানিরর বিয়ে দেব হপ্তমালার দেশে

    তারা গাই-বলদে চষে, হীরেয় দাঁত ঘষে।

    আর ছেলের পালের খেলাই বা কত!

    আয় রে আয় ছেলের পাল মাছ ধরতে যাই

    মাছের কাঁটা পায়ে ফুটেছে দোলায় চেপে যাই।

    দোলায় আছে ছ’পণ কড়ি গুনতে গুনতে যাই

    মাছ ধরার ব্যাপারটা যে সব সময়ে সুখকর হত তা বলতে পারি না|।

    খোকা যাবে মাছ ধরতে ক্ষীরনদীর কূলে

    ছিপ নিয়ে গেল কোলা ব্যাঙে, মাছ নিয়ে গেন চিলে

    খোকাদের সাজের বাহারই বা কত!

    ধন ধন ধনিয়ে কাপড় দেব বুনিয়ে

    তাতে দেব হীরের টোপ

    ফেটে মরবে পাড়ার লোক

     

    আবার

     

    খোকা যাবে নায়ে রোদ লাগিবে গায়ে

    লক্ষ টাকার মলমলি থান সোনার চাদর গায়ে

    বাপের বাড়ির দেশে বাঁদর দেখল

    ও পারেতে দুটি মেয়ে নাইতে নেবেছে

    ঝুনু ঝুনু চুলগাছটি ঝাড়তে লেগেছে

     

    আরও অনেক ছড়ারই উল্লেখ করা যেতে পারে। যে অংশে বাঁদর তার দুয়োরানী মা’র জন্য ছেলে খুঁজছে, সেখানে 18-19টি অতি পরিচিত ছড়ার অংশ ছড়ানো ছেটানো রয়েছে এমনভাবে যে তাদেরকে আলাদা করে চেনাই যায় না, গল্পের বুনটের সঙ্গে তারা এমনই মিশে গেছে।

     

    1923 সালে ভারতী পত্রিকায় অবনীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন ছেলেভোলানো ছড়া প্রবন্ধ। তাতে বলেছেন, “এই ছেলেভোলানো ছড়ার সম্পূর্ণ রূপটা ধরতে হলে এটার এক অংশ ওটায় সেটার খানিক এটায় প্রায় না জুড়ে দেখলে উপায় নেই, কাজটা ভারি শক্ত, কিন্তু ভারি চিত্তাকর্ষক”। তিনি নিজেই সে কাজটি করে দেখিয়ে গেছেন কীভাবে পুরনো ছড়ার মধ্যেকার বাল্যরস আধুনিক রূপকথাকেও সরস করে রাখে।

     

    "ক্ষীরের পুতুল'-এর আদ্যন্ত হল মা আর ছেলের সম্পর্ক। সেটা অবনীন্দ্রনাথ সুন্দর করে দেখিয়েছেন এই ছেলেভোলানো ছড়াগুলোর মধ্যে দিয়ে। রাজা যে সাগরপারের দেশ থেকে মহামূল্যবান বিচিত্র সব উপহার আনলেন সুয়োরানীর জন্য, সবই যৌতুক পেল সেই রাঙা টুকটুকে পাটলি দেশের ছোট্ট মেয়ে, যাকে আদর করে রাজা আর দুয়োরানী বরণ করে ঘরে আনলেন। এও কি সেই নস্টালজিয়ার প্রভাব?

     

     

    -------------------------------------------------------------

    তথ্যসূত্র:

    Asian Folklore Studies-এ প্রকাশিত সঞ্জয় সরকারের Shashthi's Land: Folk Nursery Rhyme in Abanindranath Tagore's "The Condensed-Milk Doll"

             


    শ্রবসী বসু - এর অন্যান্য লেখা


    ভাববিলাসী জাতীয়তাবাদ বলতে কী বুঝব আমরা? বাংলা ছড়ার সঙ্গেই বা তার কী সম্পর্ক?

    বার বার প্রচণ্ড বাধার সম্মুখীন হয়েও হাল ছেড়ে না দিয়ে বিদ্যাসাগর যে পরিবর্তনের কাণ্ডারী ছিলেন, তার দ্

    মানুষের ও দেশের সেবাকেই ধর্ম হিসেবে বরণ করেছিলেন সিএফ এন্ড্রুজ।

    সন্তানহীনা নারী বিয়ে বা পুজো বা আর কোনও মঙ্গলকর্মের অধিকারিণী নন, ঘরেও তার অনাদর।

    থোড় বড়ি খাড়ার সাম্রাজ্যে নাক গলাতে পারেনি করোনা ভাইরাস।

    ষষ্ঠীতলায় এল বান-4thpillars