Support 4thPillars

×
  • আমরা
  • নজরে
  • ছবি
  • ভিডিও

  • জনজোয়ার শাসকের আদেশ মানে না

    অমিত ভাদুড়ী | 03-01-2021

    আন্দোলনের ঢেউও ক্রমশ আমাদের গণতান্ত্রিক ‘রাজা’র দিকে এগিয়ে চলেছে

    সম্রাট ক্যানিউট সমুদ্রের ঢেউকে আদেশ দিয়েছিলেন যেন তাঁর দিকে সে না এগোয়, তাঁর জামা জুতো যেন না ভিজিয়ে দেয়। সম্রাটের ঐশ্বরিক ক্ষমতাকে অবজ্ঞা করে, সভাসদদের অপ্রস্তুত করে, সমুদ্রের ঢেউ এগিয়ে এসেছিল কথা না শুনেই। সমুদ্র তাই আজও বহমান, কারণ সে ক্ষমতার অহঙ্কারের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে সত্যিটা বলেছিল, যে দম্ভ চটুকারিতা দিয়ে লালিত ছিল

     

    কিন্তু বর্তমানে গণতন্ত্র রাজা তথা প্রধানমন্ত্রীকে এমন ঐশ্বরিক ক্ষমতা প্রদান করে না। বরং তাঁকে সার্বভৌম শাসক হওয়ার একটা সুযোগ দেয়, স্বৈরাচারী হওয়ার নয়। সংসদে প্রণীত আইনের সাহায্যে তাঁকে গণতান্ত্রিক ভাবেই রাজ্য শাসন করতে হয়। কিন্তু বর্তমানে স্বৈরাচারী শাসক হয়ে ওঠার একটা ট্রেন্ড লক্ষ্য করা যাচ্ছে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে, বিশেষত এই মহামারীর আবহে। এটির একটি কারণ হতে পারে সংসদে বিপক্ষ দলের না থাকা, বা আপৎকালীন অবস্থার দোহাই দিয়ে সংসদের কাজকর্ম মুলতুবি রাখা, বা সেই অভ্যেসের কারণে যা বর্বর সংখ্যাগরিষ্ঠ শাসক এতদিন ধরে তৈরি করে রেখেছে। 

     

    বর্তমানে দেখা যাচ্ছে আমাদের সংসদে এমন তিনটি কৃষি আইন প্রণয়ন করা হয়েছে, যার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ, প্রতিবাদের ঢেউ উঠেছে কৃষকদের মধ্যে থেকে। এবং এই প্রতিবাদে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন পাঞ্জাব, হরিয়ানা, পশ্চিম উত্তরপ্রদেশের কৃষকরা। শুধু তাই নয়, দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে দলে দলে এসে কৃষকরা এই আন্দোলনে যোগ দিচ্ছেন। তাঁরা চান এই তিনটি আইন যেন প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়। একই সঙ্গে কৃষকরা সরকারের কাছে অত্যাবশ্যক পণ্যের জন্য ন্যূনতম সহায়ক মূল্যের প্রতিশ্রুতি লিখিতভাবে চাইছেন, মৌখিক আশ্বাসে যে তাঁরা আর আশ্বস্ত হবেন না, তা স্পষ্টতই জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু সরকার রাজি হচ্ছে না

     

    এই আন্দোলনের ঢেউও ক্রমশ আমাদের গণতান্ত্রিক রাজার দিকে এগিয়ে চলেছে, এবং সেই ঢেউ যে কোনও মুহূর্তে রাজার পোশাক এবং জুতো ভিজিয়ে দিতে পারে। কিন্তু, তা ক্ষমতাবলে এখনও ঠেকিয়ে রাখা হচ্ছে। কৃষকরা নয়, ক্ষমতায় আসীন সরকার তার পুলিশদের হুকুম দিয়েছে রাজপথ ব্যারিকেড দিয়ে ঘিরে ফেলতে, প্রয়োজনে জল কামানেরও ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। কিন্তু তাতেও সেই আন্দোলনের জোয়ারে ভাটা পড়েনি, উল্টে শান্তিপূর্ণ ভাবে তা রাজধানীতে ঢোকার সমস্ত প্রবেশ পথে বেড়েই চলেছে। তাই প্রতিরোধ আরও কঠিন হচ্ছে এবং তা দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ছে। 

     

    মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বলছেন, কৃষকরা নাকি ভুল বুঝছেন। এই আইন নাকি কৃষকদের মঙ্গলের জন্যই আনা হয়েছে। তাঁরা যদি এই আইনকে স্বাগত জানান, তাহলে মাত্র কয়েক বছরে তাঁদের দ্বিগুণ উন্নতি এবং লাভ হবে। গণতন্ত্রের মসনদে আসীন রাজার সভাসদরাও তাঁর মতোই বাজারের ম্যাজিকে বিশ্বাসীন্যূনতম সহায়ক মূল্য নাকি এই উন্নতির পথে প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়াবে, এই উন্নতি সাধন একমাত্র খোলা বাজারেই সম্ভব। এই তিনটি কৃষি আইন সাহায্য করবে খোলা বাজার তৈরি করতে। এই খোলা বাজারের সাহায্যে আম্বানির দল ধীরে ধীরে কৃষি পণ্যের খুচরো বাজার কব্জা করে নিতে পারবে, বা আদানির লোকজন তৈরি করে রাখা মঞ্চে দাঁড়িয়ে আপ্রাণ দরদাম করে যাবে, যাতে যথাসম্ভব কম দামে সেইসব কৃষকদের থেকে কৃষি পণ্য কেনা যায়। অন্যদিকে, যদি কোনও সমস্যা হয় তাহলে সিভিল কোর্ট সেই মামলার সমাধান করবে না, করবে কেন্দ্রীয় সরকার। অর্থাৎ, যে কর্তৃপক্ষ আইন প্রণয়ন করল, তারাই এই বিষয়ে রায় দেবে। যে রাজ্যে এই জমিগুলি আছে, সেই রাজ্যও কোনও বক্তব্য রাখতে পারবে না এই সমস্ত ক্ষেত্রে। কেন্দ্রীয় সরকারই আইন তৈরি করবে, আবার সেই সেটা প্রণয়ন করবে, কোনও সমস্যা হলে সেই মেটাবে। অর্থাৎ নিরঙ্কুশ ক্ষমতা তার হাতে। কোনওরকম ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষা এখানে দেখা যাচ্ছে না, যা ভারতের মতো যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোর দেশে হওয়া উচিত নয়। কৃষকরা বারবার জানাচ্ছেন, তাঁরা এই আইন চান না, যা তাদের পক্ষে ক্ষতিকর। কিন্তু রাজা একনিষ্ঠ ভাবে মিডিয়ার কাছে জানিয়ে যাচ্ছেন, ওরা বোকা, ওরা ভুল বুঝছে। রাজাকে সঙ্গ দিচ্ছে তাঁর সভাসদ এবং অর্থের বিনিময়ে রাখা পণ্ডিতরা। এর একটা কারণ অবশ্য হতে পারে যে, পাকিস্তানি, খালিস্তানি, বিরোধীরা সবাই মিলে গোবেচারা কৃষকদের বোকা বানিয়ে ভুল পথে চালিত করছে!

     

    আরও পড়ুন: গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার বার্তা দিচ্ছে নতুন বছর

     

    যদিও এটাই প্রথমবার নয়, এর আগেও মুসলিমরা নাগরিকত্ব আইনের বিরোধিতা করেছিল। উপত্যকায় 370 ধারা তুলে নেওয়ার মধ্যে যে কত মহত্ত্ব আছে, তাও কাশ্মীরিরা বুঝতে পারেনি। ব্যবসায়ীরা GST বুঝতে পারেনি। ঠিক যেমনটা দেশের সাধারণ, গরিব মানুষ বিমুদ্রাকরণ বুঝতে পারেনি, বা পরিযায়ী শ্রমিকরাও বুঝতে পারেনি লকডাউন কীসের জন্য- তাদের তিলে তিলে শেষ করে ফেলার জন্য না করোনা ভাইরাস রোখার জন্য? তবে রাজা কিন্তু দৃঢ় পদক্ষেপে তাঁর দেশকে সব দিক থেকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন

     

    তাই তো দেশভক্তরা তাঁকে পুজো করছে, তাঁর গুণগান করছে, আর দেশদ্রোহীরা তাঁর নামে আকথা, কুকথা বলে বেড়াচ্ছে। তারাই (টুকড়ে টুকড়ে গ্যাং) খারাপ কথা বলছে, যারা আমাদের প্রাচীন গৌরবময় হিন্দু রাষ্ট্র নির্মাণে বাধা দিয়ে তাকে ভেঙে ফেলতে চাইছে। আসলে তারা তো এই দেশের অংশই নয়। তারা জানেই না আমাদের দেশের ঐতিহ্যময় ইতিহাসের কথা, যেখানে পুরাকালে প্লাস্টিক সার্জারির মাধ্যমে গণেশের মুখে হাতির মুখ বসানো হয়েছিল বা মুনি ঋষিরা থালা বাসন বাজিয়ে মাত্র কয়েকদিনেই মহামারী তাড়াতে সক্ষম হয়েছিল। আমরা হলফ করে বলতে পারি না যে, তাঁর সভাসদ, অর্থের বিনিময়ে রাখা পণ্ডিত এবং মিডিয়া এই বিষয়ে সহমত হবে। কিন্তু এটা বলতে পারি যে, তারা এসব বিষয়ে শাসকের সঙ্গে ভিন্নমত পোষণ করে না। চাটুকারিতা মানে না বোঝার ভান করা, আনুগত্য মানে প্রশ্ন না করা, ঊর্দ্ধতনের অধীনে কাজ করলে ভিন্নমত পোষণ করা যায় না যে খেলায়, তার নামই বোধহয় রাজনীতি। 

     

    ভাইকিং সম্রাট ক্যানিউট স্ক্যান্ডেনেভিয়ার অধিকাংশই শাসন করেছেন এবং ব্রিটেনকেও বলপূর্বক আক্রমণ করে জিতে নিয়েছিলেন। অনেক ইতিহাসবিদের মতে, তিনি একজন যথেষ্ট বুদ্ধিমান রাজা ছিলেন। রাজাদেশের চেয়ে অনেক শক্তিশালী বলের দ্বারা য়ে সমুদ্রের জোয়ার-ভাঁটা নিয়ন্ত্রিত হয়, তা তাঁর ভালই জানা ছিল। তাঁর পারিষদদের প্রবল চাটুকারিতা তাঁদের এই ধরনের সরল সাধারণ সত্য ভুলিয়ে দিচ্ছিল। এই সরল প্রজ্ঞার প্রমাণ দেওয়ার জন্যই সম্ভবত সেদিন সমুদ্র তটে তাঁর সিংহাসন নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। বলা যেতে পারে নিজের প্রজা এবং সভাসদদের শিক্ষা দেওয়ার জন্য এটি ছিল তাঁর একটি মন কি বাত তাই তো তিনি ইতিহাসে এক উজ্জ্বল কিংবদন্তি হয়ে আজও রয়ে গেছেন।ক্যানিউটের সময়কার প্রজ্ঞা ছিল এই উপলব্ধি যে রাজাদেশের থেকেও জোয়ারের ঢেউ অনেক বেশি শক্তিশালী। আর আমাদের সময়কার প্রজ্ঞার কাজ সেটাই হবে, যখন আমরা বুঝব, যে কোনও সংসদ থেকে পাশ করানো আইনের তুলনায় গণআন্দোলন অনেক বেশি শক্তিশালী। কিন্তু সেটা সম্মানের সঙ্গে মেনে নেওয়ার মতো অবস্থা কি আমাদের দেশে আছে?

    অর্থনীতিবিদ অমিত ভাদুড়ী জওহরলাল নেহরু বিশবিদ্যালয়ের (JNU) প্রাক্তন এমেরিটাস প্রফেসর, শিক্ষা কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজ, আমেরিকার ম্যাসাচুসেট্স ইন্সটিটিউট অভ টেকনোলোজি (MIT) এবং ইংল্যান্ডের কেম্ব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে; অধ্যাপনা সারা পৃথিবী জুড়ে। গরিব মানুষকেও উন্নয়নের জোয়ারে সামিল করার ব্রতে তাঁর কাজ।

     


    অমিত ভাদুড়ী - এর অন্যান্য লেখা


    কৃষি নিয়ে কৃষকের দাবিকে মর্যাদা দেওয়াই গণতন্ত্র

    পুঁজিপতিদের হাতে তামাক খাচ্ছে রাষ্ট্র, বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছেন খোলা বাজার অর্থনীতির প্রবক্তারা।

    দু’জন নতুন কৃষককে ধরলে করোনার বছরে কৃষকের আয় দ্বিগুণই হয়েছে।

    ব্যক্তির ভক্ত মানেই দেশভক্ত, তাঁর বিরোধী মানেই রাষ্ট্রদ্রোহী।

    জনজোয়ার শাসকের আদেশ মানে না-4thpillars