×
  • নজরে
  • ছবি
  • ভিডিও
  • আমরা

  • মেয়েদের ফেস নয়, বুকেই নজর ফেসবুকে

    তিয়াস বন্দ্যোপাধ্যায় | 04-03-2021

    প্রতীকী ছবি।

    বিশ্বে যা-কিছু মহান সৃষ্টি চির-কল্যাণকর...ফেসবুক নিঃসন্দেহে তার একটি। ছোটবেলায় ফেসবুক নিয়ে রচনা লিখতে হলে আমিও নির্ঘাত এর মাহাত্ম্যকীর্তনই করতাম। যেহেতু তখনও নারীহইনি, অভিশাপের মাথামুণ্ডুও অত বুঝতাম না।

     


    2012 সাল অবধি আমাদের বাড়িতে ইন্টারনেট ছিল না। ব্যক্তিগত কম্পিউটার অবশ্য ছিল একটা পরের দিকে, তবে শুধুই লেখাপড়ার জন্য। সেই নিয়েই স্নাতক স্তর অবধি গড়িয়ে গিয়েছি। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় এই যে, গুগল না করে কীভাবে এতগুলো বছর আমাদের কেটেছে, তা মনে করতেই পারি না। এখন মিনিটে পাঁচবার গুগল করেও আগেকার মতো স্পষ্ট উত্তর দিতে পারি না। এই প্রজন্মের কিশোর-কিশোরীরা অবাক হয়ে তাকায়, যখন বলি আমি বাড়িতে টেলিফোন আসতে দেখেছি। আবার সেলফোনের যুগ শেষ হয়ে অ্যান্ড্রয়েড মোবাইল বা স্মার্টফোন চালু হতে দেখেছি। আর ফেসবুক এই তো সেদিন!

     


    প্রথম ফেসবুক অ্যাকাউন্ট তৈরি করে দিয়েছিল এক বন্ধু। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরের একটা সাইবার ক্যাফে থেকে। সেই উত্তেজনার কথা আজও ভুলিনি। সেবার হাতের সামনে আপলোড করার মতো কিছু ছবিও নিয়ে গিয়েছিলাম প্রোফাইল সাজাতে। কিন্তু যবে থেকে ইনবক্সে ‘hi sexy’, ‘send your nudes’ কিংবা 30 দিন ধরে একটানা ‘hi’ ‘hi’ ‘hi’ এবং বাড়িতে ইন্টারনেট আসার পর এত রাতে কি করছ????’...এইসব টেক্সট আসতে শুরু করল, বুঝলাম ফেসবুক সামলানো আমার কম্ম নয়। একবার উত্তর দিলে প্রশ্নবাণ কমে না, উল্টে বিপদ বাড়ে। ফটোগ্রাফাররা ইনবক্সে ছবি তুলতে চায়, শিল্পীরা ন্যুড আঁকতে চায়, আর কবিরা দেখা করতে চায়। এত চাওয়া নিয়ে কোথা যাই’! আর যদি উত্তর না দিই তো ঘুরিয়ে চাবুক katha bolbena then frnd reqst accept karo kano?? Bitch!’

     

    আরও পড়ুন: নহি দেবী, নহি সামান্যা নারী

     


    সত্যিই তো! ফ্রেন্ডলিস্ট বলে কী বেডরুম নয়, যে কাউকে ঢুকিয়ে এনে শুধু দাঁড় করিয়ে রাখব? মেয়েদের জন্য সোশাল মিডিয়ার নিয়মও আলাদা। আমার সেসব আগেই জানা উচিত ছিল। 

     


    বয়সের সঙ্গে সঙ্গে এটুকু বুঝেছি ফেসবুক সামলানোর ব্যাপারটা যতটা ক্যাজুয়াল, ততটাই সিরিয়াস। বন্ধুবান্ধব পরিবার পরিজনের সঙ্গে সংযুক্ত থাকাই মূল উদ্দেশ্য নয়। ফেসবুকে সাহিত্যচর্চা থেকে শুরু করে নাচ, গান, ফোটোগ্রাফি সব ধরনের শৈল্পিক প্রতিভা প্রদর্শনের সুযোগ পাওয়া যায়। প্রতিভাহীন মানুষ এ যুগে বিরল, ফেসবুক তা জানে। দিনের শুরু আর শেষে ফ্রেন্ডলিস্টে সকলের পোস্ট আর নিউজ ফিড দেখেই মহানন্দে জীবন কেটে যেতে পারে। শুধু আপনি যদি মেয়ে হন, তাহলে সবকিছুর আগে খেয়াল রাখতে হবে আপনি একটা মেয়েহ্যাঁ, ফেসবুকেও। স্পষ্টভাবে বলতে গেলে একজন যুবতী নারী ফেসবুক প্রোফাইল খুলেছেন মানেই সমাজ ধরে নিচ্ছে তিনি শয্যাসঙ্গিনী হতে আগ্রহী

     



    একটা মজার বিষয় লক্ষ্য করলে দেখবেন পুরুষরা চিরকালীন ভলেন্টিয়ার, বিশেষত শিভ্যালরি দেখানোর ক্ষেত্রে। ফেসবুক শিভ্যালরির মূল নীতি হল দুঃস্থ নারীর উপর ঝাঁপিয়ে পড়া। ভার্চুয়াল পুরুষবন্ধুরা কীভাবে জানবে আপনি দুঃস্থ? আমাকে একজন ফেসবুক পুরুষ নিজেই লিখেছিলেন- সবুজ আলো জ্বালিয়ে বসে আছ দেখে পিং করলাম।' তখনই হঠাৎ বুঝিনি। পরে বুঝলাম চ্যাটবক্সের সবুজ আলোই নিদর্শন যে, আমার জৈবিক তাড়নায় ঘুম হচ্ছে না। অথচ তখন আমি মশগুল ছিলাম পেজে একটা ইতিহাসভিত্তিক আর্টিকেলে। এর পরপরই আমি কম্পিউটারে ফেসবুক করা ছেড়ে দিই। স্মার্ট ফোনে ফেসবুক করার কিছু সুবিধে রয়েছে। মেসেঞ্জার অ্যাপ ইনস্টল না করলেও ফেসবুকের বাকি সুবিধাগুলো সেখানে পাওয়া যায়। কিন্তু একেবারে মেসেঞ্জার ছাড়া-ই বা চলে কী করে! প্রয়োজনীয় কথা তো অনেকের সঙ্গেই বলতেই হয় দেশ-বিদেশের টাইম জোন মিলিয়ে। মেয়ে মানে যে শুধু চেনা ছকে অপরিচিত পুরুষদের জন্য বাতি জ্বালিয়ে অপেক্ষা করতে হবে ইনবক্সে একটা ‘hi’ পাওয়ার জন্য, সেটা তো নাও হতে পারে। কিন্তু এ ব্যাপারে পুরুষদের বেশ নিশ্চিত মনে হয়। সরকারি আমলা, আইনজীবী, অধ্যাপক কিংবা ডাক্তার, একজন নারীর পদ যাই হোক, ফেসবুক পুরুষদের কাছে তিনি সবসময়েই সুলভ। অবাধে চোখ ঘুরবে তাঁর প্রতিটি দেহ ভঙ্গিমায়। তারপর ইনবক্সে আসবে ‘hiiii!! Amra ki frnd hote pari???’

     



    অপমানিত বোধ করে কোনও নারী যদি তাঁর ইনবক্সের স্ক্রিনশট নিয়ে ওয়ালে পোস্ট করেন, তখন তাঁকে নিয়েই উল্টে মশকরা শুরু হবে। অনেক পরিচিত মুখ নিঃশব্দে পাশ কাটিয়ে আত্মগোপন করবে, কারণ তারা পুরুষটিকে কোনও নামী ব্যান্ডে গান গাইতে দেখেছে, অথবা পুরুষটি তাদের অধিক পরিচিত।  

     



    আমার একবার কোনও এক জনপ্রিয় কবির সঙ্গে এমনটা হয়েছিল। তাঁকে আমি চিনতাম না। যেমন অনেককেই চিনি না, আমারই ভুল। রাত-দুপুরে ইনবক্সে হঠাৎ অদ্ভুত প্রশ্নের উৎপাতে বিরক্ত হয়ে কিছু বা কড়া কথা তাঁকে বলে থাকব। তারপর যথারীতি কাজ সেরে ঘুমিয়ে পড়ি। সকালে ঘুম ভাঙল এক বন্ধুর ভয়ার্ত ফোন কলে। শিগগির ফেসবুক খোল, তোর কাল রাতের চ্যাট ভাইরাল হয়ে গ্যাছে।' আমি ধীরে সুস্থে ফেসবুক খুলে দেখলাম সেই মহান ব্যক্তি আমার ঔদ্ধত্য বিষয়ে কিছু চমকপ্রদ কথা লিখে গত রাতের কথোপকথন নিজের ওয়ালে পোস্ট করেছেন। সেই পোস্টে হাজার হাজার সহানুভূতি জানিয়েছে ভার্চুয়াল দুনিয়া, যদিও বেশিরভাগেরই আক্রোশ আমার অশিক্ষা এবং অজ্ঞতা নিয়ে। সে বিষয়ে আমিও অবশ্য একমত। তবে বলাই বাহুল্য যে, আমার পরিচিত দু'-একজন ছাড়া সেদিন আমার পক্ষ নিয়ে কাউকেই কিছু বলতে দেখিনি। আমি তো আর কেউকেটা নই! অতএব, রাতারাতি ভিলেন হিসেবেই ভাইরাল হয়ে গেলাম

     



    প্রশ্ন উঠতে পারে, এতকিছুর পরে বাপু ফেসবুক করতে হবে এমন মাথার দিব্যি কে দিয়েছে? ওই যে বললুম, আমারও দরকার পড়ে। শুধু কিছু উটকো অচেনা পুরুষের সঙ্গে গল্প করতেই তো ফেসবুকে আসিনি, ফুরফুরে এক স্বাধীন ভার্চুয়াল মন নিয়ে এসেছিলাম। বড় একটা পেজ চালাব, গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য পেশ করে স্টেটাস দেব, ফ্যান-ফলোয়ার নিয়ে ক্যাম্পেইন করব, সারা পৃথিবীর খবর রাখব কিংবা নিজের কাজ শেয়ার করব। ফেসবুকের কাছে এর চেয়ে বেশি কিছু প্রত্যাশা বোধহয় ছিল না। কিন্তু মেয়েদের ক্ষেত্রে এদেশে ফেসবুকের অন্যান্য ব্যবহারের গুরুত্ব নেই। মেয়েরা কাজ শেয়ার করলে কে-ই বা দেখছে! সেজেগুজে সেলফি দিলে তখনই হাজারটা লাইক

     



    একজন নারী অপর একজন নারীর পাশে থাকছেন, এমনটা এ সমাজে যেমন বিরল, ফেসবুকেও এর ব্যতিক্রম দেখা যায় না। মনে রাখতে হবে, সোশাল মিডিয়া সমাজেরই বিমূর্ত উপস্থিতি, সমাজের বাইরের নয়। যেখানকার সমাজ যেমন, তার ছাপ তো ফেসবুকের মতো নেটওয়ার্কিং সাইটেও পড়বে। রাস্তায় চলতে ফিরতে যেসব পুরুষরা অচেনা মেয়েদের দিকে তাকিয়ে অশ্লীল ইঙ্গিত করে, ভিড়ের মধ্যে লুকিয়ে থেকে ফাঁক পেলেই মেয়েদের যৌনাঙ্গ স্পর্শ করে, আর সামনে পড়লে চোখে চোখ রেখে কথাটি পর্যন্ত বলতে পারে না, তারাই রাতে ফেসবুকের আড়ালে সক্রিয় হয়। ফ্রেন্ডলিস্টের সমস্ত মেয়ের প্রতি তাদের অসীম করুণা এবং শিভ্যালরি উপচে পড়ে। আরও আশ্চর্য লাগে যখন দেখি, কোনও কোনও কেউকেটা নারী আমারই মতো কোনও এক অজ্ঞ নারীকে কমেন্টে কিংবা ইনবক্সে কোণঠাসা করে সেইসব পুরুষদের পোস্টে গিয়েই ভিড় করে। বড্ড অসহায় লাগে! সে গল্প পথঘাটেরও। কত আর বলি, আজ থাক...


    তিয়াস বন্দ্যোপাধ্যায় - এর অন্যান্য লেখা


    সিঙ্গুরে মাস্টারমশাই সত্যিই তো ইতিহাস যে তালগোল পাকিয়ে দিলেন একেবারে।

    পড়ুয়াদের মনের অতলে কী চলছে, তা জানতে ব্যর্থ হচ্ছে সরকারি স্কুলগুলি।

    স্কুলেরও আগে যে শিক্ষা, তার থেকে এক বছর বঞ্চিত শিশুরা।

    চিড়িয়াখানায় খাঁচার ভিতরের চেয়ে বাইরে বেশি আমোদ।

    অধার্মিক হওয়ার অনেক জ্বালা, ধার্মিকের দায় শুধু নিঃশর্ত আনুগত্যেই।

    ফেসবুক বা সোশাল মিডিয়ায় অনেক পুরুষের কাছে নারী মানেই সহজে সস্তায় পণ্য।

    মেয়েদের ফেস নয়, বুকেই নজর ফেসবুকে-4thpillars

    Subscribe to our notification

    Click to Send Notification button to get the latest news, updates (No email required).

    Not Interested