×
  • নজরে
  • ছবি
  • ভিডিও
  • আমরা

  • ভীমা কোরেগাঁও মামলায় কম্পিউটারে ভুয়ো নথি ঢোকানোর প্রমাণ

    শ্রীগিরীশ জলিহাল, দ্য রিপোর্টার্স কালেক্টিভ | 21-04-2021

    রিপোর্টের চুম্বক: এই মামলায় 16 জন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, আইনজীবী, মানবাধিকার কর্মী দেশবিরোধী ষড়যন্ত্রের দায়ে অভিযুক্ত। দুই বছরের বেশি সময় ধরে তাঁরা বিনা বিচারে, বিনা জামিনে জেলে বন্দি– একমাত্র ভারভারা রাও জামিন পেয়েছেন কিছু দিন আগে। অন্যতম অভিযুক্ত রোনা উইলসনের বাজেয়াপ্ত করা কম্পিউটারটি আদালতের নির্দেশে ফেরত পাওয়ার পর সেটিকে আমেরিকার বিখ্যাত ডিজিটাল ফরেনসিক কোম্পানি আর্সেনালের কাছে বিশ্লেষণের জন্য পাঠানো হয়েছিল। আর্সেনালের দ্বিতীয় রিপোর্টটি থেকে দেখা যাচ্ছে, উইলসনের কম্পিউটার হ্যাক করে তাতে 22টি ফাইল ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছিল। এই ফাইলগুলোই আদালতে প্রধান প্রমাণ বলে সরকার পক্ষ দাবি করে এসেছে। অথচ উইলসন নিজে কখনও এগুলো দেখেননি, খোলেননি, তিনি এগুলোর কথা জানতেনই না। তদন্তকারী সংস্থা NIA অবশ্য বলছে বেসরকারি ডিজিটাল ফরেনসিক সংস্থার রিপোর্ট তাদের কাছে গ্রাহ্য নয়। এদিকে সরকারি ফরেনসিক ল্যাবরেটরি (যারা ওই কম্পিউটারটি পরীক্ষা করেছে) তাদের কাছে যখন জানতে চাওয়া হয়েছিল যে তাতে হ্যাকিং করে ফাইল ঢোকানো হয়েছি কিনা, তারা হ্যাঁ বা না কোনও উত্তরই দেয়নি।

     

    বিস্তারিত কাহিনী

    2018 সালে মহারাষ্ট্রের ভীমা কোরেগাঁওতে হিংসাত্মক ঘটনা ঘটার পড়ে মানবাধিকার কর্মী রোনা উইলসন কপিউটারে একজন হ্যাকার 22টি আপত্তিকর ফাইল প্ল্যান্ট করেছিল বলে একটি আমেরিকান ডিজিটাল ফরেনসিক কোম্পানির নতুন রিপোর্টে জানা যাচ্ছে। 2018 সালের 15 নভেম্বর থেকেই প্রথমে পুনে পুলিশ, তারপর জাতীয় তদন্তকারী সংস্থা (NIA) এই ফাইলগুলোকে প্রধান প্রমাণ বলে দেখিয়ে আসছে। এই প্রমাণের ভিত্তিতেই রোনা উইলসন সহ 15 জন আইনজীবী, অধ্যাপক, শিল্পীকে গ্রেপ্তার করে জামিন না দিয়ে জেলে রাখা হয়েছে দু'বছরের বেশি। তাদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের অভিযোগে। অবশ্যই এদের মধ্যে একমাত্র ভারভারা রাও জামিনে মুক্ত।

     

    আর্সেনাল কনসাল্টিং সংস্থার নতুন রিপোর্ট বলছে একজন হ্যাকার সফ্টওয়্যারের মাধ্যমে কম্পিউটারে ওই ফাইলগুলো ঢুকিয়ে দিয়েছিল। বাস্তবে তা উইলসনের কম্পিউটারে কখনওই তৈরি করা, খোলা বা ব্যবহার করা হয়নি। বলা দরকার, 2019 সালে আদালতের নির্দেশে পুলিশ উইলসনের কম্পিউটারটি ফেরত দেয় এবং তার আইনজীবীর অনুরোধেই ওই সংস্থা কম্পিউটারটির তথ্য বিশ্লেষণ করে।

     

    গত ফেব্রুয়ারি মাসেই আর্সেনালের প্রথম রিপোর্টে প্রকাশ পেয়েছিল যে, গোপন সফ্টওয়্যারের মাধ্যমে হ্যাকাররা দশটি আপত্তিকর চিঠি তার কম্পিউটারে ঢুকিয়ে দিয়েছিল এবং দীর্ঘদিন ধরে তার উপর গুপ্তচরবৃত্তি করা হত। নতুন রিপোর্টটি আগেকার রিপোর্টটিরই ফলো আপ। Article 14 এই দ্বিতীয় রিপোর্টটি দেখেছে। তাতে বলা হয়েছে, উইলসনের কম্পিউটারে এই বাড়তি ফাইলগুলো কোনও বৈধভাবে ব্যবহার হয়নি। প্রথম রিপোর্টে যে হ্যাকারকে চিহ্নিত করা হয়েছিল সেই 24টির মধ্যে 22টি ফাইল ঢুকিয়েছে। এই 24টি বাড়তি ফাইলে প্রধানত রয়েছে, নিষিদ্ধ মাওবাদীদের মধ্যে সাজানো কথোপকথন, ফান্ড ট্রান্সফার নিয়ে আলোচনা, সংগঠনের মহিলাদের প্রতিনিধিত্ব, সরকারি অভিযান নিয়ে আশঙ্কা এবং কিছু মাওবাদী গেরিলাদের ছবি।

    NIA-এর মুখপাত্র জয়া রায়কে ই-মেল করে Article 14 এই বিষয়ে বিস্তারিত জানতে চেয়েছিল। আর্সেনালের রিপোর্ট এবং সরকারি ফরেনসিক ল্যাবের রিপোর্ট নিয়ে প্রশ্ন করা হয়েছিল তাঁকে। ই-মেলের উত্তর না দিলেও, টেলিফোনে Article 14 কে তিনি বলেন, ‘আমরা বেসরকারি ল্যাবরেটরির রিপোর্টকে মান্যতা দিই না। আমরা নির্ভর করি সরকারি ফরেনসিক ল্যাবরেটরির উপর।'

    ভীমা কোরেগাঁও মামলায় অভিযুক্ত 16 জনের বিরুদ্ধে মামলা নিষ্পত্তি হতে সম্ভবত বহুদিন লাগবে। আইনজীবীরা এখন তাদের জামিনে মুক্ত করার চেষ্টা করছেন। রোনা উইলসনের আইনজীবীরা যেমন এই আর্সেনালের দ্বিতীয় রিপোর্টটি উল্লেখ করে আবারও জোরদার ভাবে বলবেন যে, প্রাথমিক ইলেকট্রনিক প্রমাণটি ভুয়ো, এবং যেহেতু কম্পিউটারের ফাইলে নাড়াঘাঁটা করা হয়েছে সেহেতু সেই কম্পিউটারের সমস্ত সাক্ষ্য প্রমাণই গ্রাহ্য নয়।

     

    অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে তথাকথিত ইলেকট্রনিক প্রমাণ

    2017 সালের 31 ডিসেম্বর পুনের কাছে ছোট্ট শহর ভীমা কোরেগাঁওয়ে আয়োজন করা হয়েছিল এলগার পরিষদের। উচ্চবর্ণের পেশোয়া বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রধানত দলিতদের নিয়ে গড়া ব্রিটিশ বাহিনীর বিজয়ের 200 বছর পূর্তি ছিল উপলক্ষ। দলিতদের অতীত গৌরব উদযাপনের এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে হিংসা মারামারি হয়, উগ্র হিন্দত্ববাদীদের সঙ্গে দলিতদের সংঘর্ষ ঘটে। ঘটনার তদন্ত করতে গিয়ে পুনে পুলিশ মাওবাদী ষড়যন্ত্র আবিষ্কার করে এবং ঘটনার ফোকাস গিয়ে পড়ে আরবান নকশালদের উপর। হিন্দুত্ববাদী নেতারা শহুরে বুদ্ধিজীবী এবং মানবাধিকার কর্মীদের ব্যঙ্গ বিদ্রুপ করতে এই শব্দটা ব্যবহার করতে শুরু করেন।

     

    পুলিশ উদ্যোক্তাদের বাড়িতে হানা দিয়ে ল্যাপটপ, হার্ডডিস্ক এবং অন্যান্য ডিভাইস আটক করে। চার্জশিট অনুসারে অন্যতম উদ্যোক্তা সুদীপ ধাওয়ালের সঙ্গে যোগাযোগ থাকার জন্যই রোনা উইলসন এবং আইনজীবী সুরেন্দ্র গ্যাডলিংয়ের বাড়িতে হানা দেওয়া হয়।

    উইলসনের কম্পিউটার থেকে পাওয়া ফাইলগুলো আইনজীবী, মানবাধিকার কর্মী সুধা ভরদ্বাজ, ভারভারা রাও এবং তার বিরুদ্ধে প্রমাণ হিসেবে পুলিশ দাখিল করে।

    মহারাষ্ট্রে বিজেপির হাত থেকে বর্তমান মহাবিকাশ আঘারির (শিবসেনা, কংগ্রেস এবং এনসিপি-র জোট) সরকার গঠনের ঠিক পরেই ঘটনার তদন্তের ভার পুনে পুলিশের থেকে নিয়ে দেওয়া হয় NIA-কে। NIA অতিরিক্ত চার্জশিট ফাইল করে জেসুইট পুরোহিত স্ট্যান স্বামী, দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হ্যানিবাবু টারায়িল, গোয়া ইনস্টিটিউট অফ ম্যানেজমেন্টের অধ্যাপক আনন্দ তেলতুম্বে এবং সাংবাদিক গৌতম নওলাখার নাম যুক্ত করে। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, নিষিদ্ধ মাওবাদী গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত হয়ে ভারত সরকারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছেন তারা। তাদের কুখ্যাত UAPA আইনে অভিযুক্ত করা হয়। সন্ত্রাসবাদ বিরোধী এই আইনে কার্যত অভিযুক্তকে নিজেকেই নিরপরাধ প্রমাণ করতে হয়।

     

    আর্সেনালের নতুন রিপোর্ট ধরা পড়েছে একটা ইলেকট্রনিক অ্যাকশনের শৃঙ্খল। এটাকে বলা হয় প্রসেস ট্রি। এটার সাহায্যেই কম্পিউটারে ওই আপত্তিকর নথিপত্র ঢোকানো হয়েছিল। দশটি ফাইল যে হ্যাকার ঢুকিয়েছিল তার ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট আর্সেনাল পেয়েছে।

    আর্সেনালের পরীক্ষায় ধরা পড়েছে যে হ্যাকার ফাইলগুলোর নাম বদলে দিয়েছে। এমনকি একবার ভুল করে তা সংশোধনও করেছে।

     

    আর্সেনালের প্রেসিডেন্ট মার্ক স্পেনসার আর্টিকল 14কে ব্যাখ্যা করেছেন, নতুন রিপোর্ট সম্পর্কে। তিনি বলেন, ‘mohila meeting jan pdf’ এই সাইট সংক্রান্ত প্রসেস ট্রিতে হ্যাকিং-এর অকাট্য নজির পাওয়া যাচ্ছে। এই যে ‘mohila meeting’ ফাইলের কথা বলা হচ্ছে, সেটা 2 জানুয়ারি 2018-তে নাকি হয়েহিল, যাতে অভিযুক্ত মহিলারা সুধা ভরদ্বাজ, সুশান আব্রাহম, সোমা সেন সহ mass organisation (MO)-এর সদস্যরা নাকি অংশগ্রহণ করেছিলেন। স্পেনসার যে প্রসেস ট্রির কথা বলছেন, সেখান থেকে ইন্টারনেট আক্রমণকারীরা কীভাবে, কখন, তাদের শিকারের কম্পিউটারে আপত্তিকর ফাইল ভরে দিয়েছিল, তার সমস্ত তথ্য বেরিয়ে আসছে। এটা করা হয়েছিল, NetWire নামক একটি সফটওয়্যারের মাধ্যমে। এটা সেই ইলিয়াডের ট্রোজান ঘোড়ার মতো, অন্য কারও কম্পিউটারে ঢুকিয়ে দিলে, সে বুঝতেও পারবে না, কিন্তু বাইরে থেকে যে নিয়ন্ত্রণ করছে, সে কম্পিউটারে যা খুশি পরিবর্তন, সংশোধন, সংযোজন সবই করতে পারে। উইলসনের ল্যাপটপে এই ফাইলগুলো উল্লেখ করেই তাঁকে এবং অন্যদের পরবর্তীকালে আদালতে অভিযুক্ত করেছে তদন্তকারীরা।



    ঘটনার 11 দিন পর জাল নথিপত্র কম্পিউটারে ঢোকানো হয়

    আর্সেনালের সন্ধান পাওয়া প্রসেসট্রি থেকে দেখা যাচ্ছে, ভীমা কোরেগাঁওয়ের হিংসাত্মক ঘটনার এগারো দিন পর 2018 সালের 11 জানুয়ারি বিকেল পাঁচটা চার মিনিটে ওই কম্পিউটারে NetWire অটোমেটিকালি খুলে যায়। অর্থাৎ, যে সমস্ত নথিপত্রের ভিত্তিতে তদন্তকারীরা দাবি করছেন যে, ঘটনাটি পূর্বপরিকল্পিত ষড়যন্ত্র, সেই সমস্ত নথিপত্রই জাল করে কৃত্রিম ভাবে তৈরি করা শুরু হয় ঘটনা ঘটে যাওয়ার 11 দিন পরে উইলসনের কম্পিউটারে ভুয়ো ফাইল বসাতে গিয়ে হ্যাকার কম্যান্ডে একটা ভুলও করে। স্পেনসারের কথায়, এই ধরনের ইন্টারনেট আক্রমণকারীর পক্ষে ভুল করা খুবই বিরল ঘটনা। আমাদের তথ্য উদঘাটনের দিক থেকে এটা একটা বিরাট বড় ব্যাপার। উইসনের কম্পিউটারে যে তার অজ্ঞাতসারে, NetWire সফটওয়্যারটি চলছিল, তার অকাট্য প্রমাণ আর্সেনাল পেয়েছে। যার মধ্যে একটা হল, এই স্ক্রিনশট।

    রোনা উইলসনের কম্পিউটারে কীভাবে এসব কারিকুরি করা হয়েছে, তার সমস্ত প্রমাণই আর্সেনালের কাছে রয়েছে৷ ল্যাপটপ ছাড়াও হার্ডডিস্ক এবং পেনড্রাইভের বিভিন্ন ফাইলও তদন্তকারীরা উইলসন এবং অন্যদের ফাঁসাতে ব্যবহার করেছেনএটাও কিন্তু হ্যাকারদেরই কাজউইলসনের কম্পিউটার থেকে এক্সটারনাল হার্ডডিস্কে ফাইলগুলো যাতে নিজের থেকেই চলে যায়— সেই ব্যবস্থাও হ্যাকাররা করে রাখেআর্সেনালের কর্ণধার স্পেনসার পরিষ্কার বলছেন, আমরা যা বলছি কিংবা আমাদের প্রথম ও দ্বিতীয় রিপোর্টে যা বলা হয়েছে, তা আমাদের মুখের কথায় কারও বিশ্বাস করার দরকার নেইকিন্তু এই ধরনের জালিয়াতি, যোগ্য ডিজিটাল ফরেনসিক বিশেষজ্ঞরা সবার সামনে বললেই করে দেখাতে পারেনতাতেই বোঝা যাবে এই তথাকথিত ইলেকট্রনিক সাক্ষ্যপ্রমাণ কীভাবে ইচ্ছামতো তৈরি করা যায়স্পেনসারের কথায়, ‘এই প্রসেস ট্রি আসলে ওই হ্যাকারকে একদম হাতেনাতে ধরে ফেলেছে। পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে, আপত্তিকর নথিপত্র কীভাবে উইলসনের কম্পিউটারে ঢোকানো হয়েছিলউল্লেখ্য 2013 সালে বোস্টন ম্যারাথনে যে বোমা বিস্ফোরণ হয়েছিল, এবং 2014 সালে একজন তুর্কি সাংবাদিককে যেভাবে ফাঁসানো হয়েছিল, সেই সমস্ত ঘটনায় কম্পিউটার সংক্রান্ত বিষয়ে বিশেষজ্ঞ হিসাবে কাজ করেছিলেন এই স্পেনসার



    NIA-র দাবি ইলেকট্রনিক সাক্ষ্যপ্রমাণ ছাড়াও আরও তথ্য আছে

    আর্সেনালের প্রথম রিপোর্টের ভিত্তিতে আনন্দ তেলতুম্বের আইনজীবীরা যখন তাঁর জামিনের আবেদন করেছিলেন, তখন তার বিরোধিতা করে NIA বলেছিল, এই রিপোর্ট প্রমাণিত সত্যনিষ্ঠ নয়অথচ NIA নিজেই পাতার পর পাতা জুড়ে এই ধরনের তথাকথিত ইলেকট্রনিক সাক্ষ্যপ্রমাণই আদালতে দাখিল করেছেনিরপেক্ষ সংস্থার তদন্তে যখন দেখা যাচ্ছে, সেগুলো সবই ভুয়ো NIA গত 10 ফেব্রুয়ারি একটা বিবৃতি দিয়ে কার্যত আর্সেনালের প্রথম রিপোর্টকে অগ্রাহ্যই করতে চেয়েছেতাদের বক্তব্য পুণের রিজিওনাল ফরেন্সিক সায়েন্স ল্যাবরেটরি ভারতীয় আদালতে যে রিপোর্ট দিয়েছে, সেটাই গ্রহণযোগ্য। তারা কোনও চোরাগোপ্তা কম্পিউটার প্রোগ্রাম (ম্যালওয়ার)-এর কথা বলেনি। বাকি সব (আর্সেনালের দিকে ইঙ্গিত করে) তথ্যের বিকৃতি



    সরকারপক্ষ আদালতে যে সমস্ত নথিপত্র দাখিল করেছে, আমরা সেসব পুঙখানুপুঙখ পরীক্ষা করেছি। তাতে দেখা যাচ্ছে যে, 2018 সালের 13 অক্টোবর মামলার তদন্তকারী অফিসার সরকারি ফরেন্সিক ল্যাবরেটরিতে জিজ্ঞাসা করেছিলেন যে, অভিযুক্তদের কম্পিউটারসহ বিভিন্ন ইলেকট্রনিক ডিভাইস কেউ গোপনে নাড়াঘাঁটা করেছে কিনা। তাতে সরকারি ল্যাবরেটরি কোনও জবাব দেয়নি। আদালতে তখন সরকারপক্ষ বলে, কিছু ফরেন্সিক রিপোর্ট পাওয়া বাকি আছে NIA-র একটি রিপোর্টে (যা কিনা চার্জশিটের অংশ), তাতে লেখা হয়, "কিছু ফরেন্সিক সায়েন্স ল্যাবরেটরি রিপোর্ট এখনও পাওয়া বাকি আছে।' এই বিষয়ে জিজ্ঞাসা করা হলে NIA মুখপাত্র জয়া রায় বলেন, ‘NIA ইতিমধ্যেই এই মামলায় চার্জশিট দাখিল করেছে এবং বিচারাধীন বিষয়ে আমি কথা বলব না।'



    প্রথমে পুণে পুলিশ এবং তারপরে NIA দাবি করে আসছে যে, তাদের কাছে কম্পিউটারে ইলেকট্রনিক প্রমাণ ছাড়াও অন্য প্রমাণ আছেঅন্যদিকে মানবাধিকার কর্মী এবং আইনজীবীরা পালটা বলে আসছেন যে, সরকার তাদের আদর্শগত বিরোধীদের ফাঁসানোর জন্য জাল তথ্যপ্রমাণ তৈরি করেছে। উইলসনের আইনজীবী মিহির দেশাই-এর মতে, 2014 সাল থেকেই এই ছক কষা হয়েছে। মানবাধিকার কর্মীদের বেছে বেছে টার্গেট করে এমন ভাবে মিথ্যা মামলায় ফাঁসানো হচ্ছে, যাতে তাঁরা দীর্ঘদিন জেলবন্দি থাকেন। তিনি বলেন, "প্রমাণ হিসাবে সরকারপক্ষ যে সমস্ত ইলেকট্রনিক নথিপত্র দাখিল করেছে, তার মধ্যে একটা হল, ভারতীয় বিপ্লবের রণনীতি ও কৌশল (Strategy and Tactics of Indian Revolution) এটা কোনও গোপন নথি নয়। যে কেউ চাইলে দেখে নিতে পারেন' আপনিও গুগল করে দেখে নিতে পারেন


     
    অন্যান্য তথ্যপ্রমাণ: বিরক্তিকর গান’, ‘বিভ্রান্তিকর ইতিহাস

    অভিযুক্ত 16 জনের বিরুদ্ধে মামলা সাজাতে গিয়ে পুনে পুলিশ প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ অনুসারে যে সমস্ত তথ্যপ্রমাণ হাজির করেছে, তার মধ্যে আছে এলগার পরিষদের "বিরক্তিকর গান' এবং "বিভ্রান্তিকর ইতিহাস'-এর প্রচার, যার উদ্দেশ্য নাকি অনুন্নত শ্রেণির মধ্যে "মাওবাদী আদর্শ প্রচার করা'এই সমস্ত তথাকথিত "সাক্ষ্যপ্রমাণ' NIA নিজেও তাদের চার্জশিটে 16 জনের বিরুদ্ধে ব্যবহার করেছে৷ এই সমস্তই নাকি দেশদ্রোহ, এবং ভারত রাষ্ট্রকে বিপন্ন করার চেষ্টা৷



    উইলসনের আইনজীবী দেশাইয়ের প্রশ্ন, প্রতিবাদী গান কার কাছে বিরক্তিকর? যুগে যুগে সমাজসংস্কারক এবং বিপ্লবী কবিরা এই সমস্ত গান গেয়েছেন। জাতিবাদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়ে গান মহারাষ্ট্রের সংস্কৃতির অঙ্গ। আন্নাভাই সাথে, শাহির আমর শেখ, ডিএন গাভানকর এবং বিলাস ঘোগড়ে ও সামভাজি ভগতের মতো ছড়াকাররা হচ্ছেন মহারাষ্ট্রের সংস্কৃতির অঙ্গ। অভিযুক্ত 16 জনের বিরুদ্ধে মামলায় এলগার পরিষদের সাংস্কৃতিক শাখা কলামঞ্চের গাওয়া একটি গানকে সরকারের বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়ানোর দায়ে অভিযুক্ত করা হয়েছে। এই গানের কথাগুলো হচ্ছেএইরকম— "জব জুলম হোতো বাঘাওয়াত হোনি চাহিয়ে শহর মেঁ, আগর বাঘাওয়াত না হো তো, বেহতার হো কে, ইয়ে রাত ঢালনে সে পহলে শাহর জলকার রাখ হো জায়ে' (যদি নিপীড়ন হয়, তবে শহরে বিদ্রোহ হওয়া উচিত। যদি বিদ্রোহ না হয়, তবে সূর্যোদয়ের আগেই সেই শহরের ছাই হয়ে যাওয়া উচিত)



    চার্জশিটে বলা হচ্ছে যে, উইলসন সহ 16 জন অভিযুক্তই মনে করেন যে, বিজেপি এবং আরএসএস ব্রাহ্মণকেন্দ্রিক বলে দলিতরা তাদের বিরুদ্ধে এবার এই ভাবনাটাকেই কল্পিতভাবে বাড়িয়ে নিয়ে গিয়ে চার্জশিটে সিদ্ধান্ত হল যে, বিজেপি এবং আরএসএস-এর বিরুদ্ধে দলিতদের এই মনোভাবকে অভিযুক্তরা ব্যবহার করতে চাইছেন কল্পনার পাখা আর একটু বিস্তার করে, এই তথাকথিত প্রমাণের ভিত্তিতে সরকার পক্ষের দাবি হল, যে 16 জন মানবাধিকার কর্মী, কবি এবং শিক্ষাবিদ, দেশের অখণ্ডতা এবং সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে কাজ করছেন

     

    পুলিশের চার্জশিটের একটা প্যারাগ্রাফে বলা হচ্ছে, "বাজেয়াপ্ত করা নথিপত্র থেকে দেখা যাচ্ছে যে, অনগ্রসর শ্রেণির ভাবনা এখন ব্রাহ্মণকেন্দ্রিক বিজেপি-আরএসএস এর বিরুদ্ধে যাচ্ছে। সেটাকে পুঁজি করে বড় আকারের বিশৃঙ্খলা তৈরিই এদের লক্ষ।' আর্সেনালের রিপোর্ট অনুসারে ওই সব নথিই জাল, ভুয়ো, অভিযুক্তের অজ্ঞাতসারে তাঁর কম্পিউটারে ঢোকানো হয়েছিল।



    (শ্রীগিরীশ জলিহাল রিপোর্টার্স কালেকটিভের সদস্য www.reporters-collective.in, এই প্রতিবেদনটি ইংরেজিতে আর্টিকেল 14-, www.article-14.com প্রকাশিত হয়েছে)

     


    শ্রীগিরীশ জলিহাল, দ্য রিপোর্টার্স কালেক্টিভ - এর অন্যান্য লেখা


    দেশদ্রোহের মামলায় অভিযুক্তের কম্পিউটার হ্যাক করে 22টি ফাইল ঢুকিয়ে দেওয়ার অকাট্য প্রমাণ।

    ভীমা কোরেগাঁও মামলায় কম্পিউটারে ভুয়ো নথি ঢোকানোর প্রমাণ-4thpillars

    Subscribe to our notification

    Click to Send Notification button to get the latest news, updates (No email required).

    Not Interested