Support 4thPillars

×
  • আমরা
  • নজরে
  • ছবি
  • ভিডিও

  • অনলাইনে কিন্ডারগার্টেন হয় না

    তিয়াস বন্দ্যোপাধ্যায় | 23-02-2021

    প্রতীকী ছবি।

    একরত্তি রণিত বাড়িতে খেলনা ভাঙচুর করছে, আছাড় খেয়ে পড়ে কাঁদছে, কিন্তু তাকে সময় দেওয়ার কেউ নেই। মা-বাবা দু’জনেই দু’টি ঘরে অফিসের কাজে ব্যস্ত। করোনা পরিস্থিতিতে সুবলা মাসিকে আসতে বারণ করে দেওয়ার পর থেকেই রণিতকে আর সামলানো যাচ্ছেনা। প্রি-স্কুলে যাওয়া তার বন্ধ; বাবা মায়ের ওয়ার্ক ফ্রম হোমের চাপ মিটতে মিটতে প্রায় রাত দশটা।

     

    অন্যদিকে লকডাউন যখন শুরু হল রিয়ার বয়স ঠিক দু’বছর। প্রি-স্কুলে আর পাঁচটা সমবয়সী বাচ্চাদের সঙ্গে সময় কাটানোর অভিজ্ঞতা যে বয়সে সবথেকে বেশি প্রয়োজন, সেই গোটা একটা বছর বাড়িতে বন্দি রিয়াও। রিয়ার মা মিসেস দত্তর কথায় “আমার মেয়ে অচেনা কাউকে দেখলেই ভয় পায়। বাড়িতে চেনা মুখে ও এতটা অভ্যস্ত হয়ে গেছে যে, এরপর তিন বছর হলে যখন বড় স্কুলে ভর্তি করার চেষ্টা করব, একা অতক্ষণ সকলের সঙ্গে মানিয়ে নেবে কীভাবে তাই বুঝতে পারছি নাএদিকে প্রি-স্কুলে ভর্তি করার সময় পেরিয়ে যাচ্ছে, করোনার আতঙ্ক কাটলে যদি স্কুল শুরু হয় অন্তত ছ’মাসের জন্য হলেও প্রি-স্কুলে পাঠাতে চাই ওকে। একটু পরিবেশটা বুঝুক। অন্যান্য বাচ্চাদের সঙ্গে মিশুক। নিজের কাজ বাকিদের দেখাদেখি নিজে করতে শিখুক। এখন আমাদের এক মুহূর্ত না দেখলেই কাঁদে। বড় স্কুলে তো অনেকটা সময় একা কাটাতে হবে। তার আগে একটু অভ্যাস না হলে খুব বিপদে পড়ে যাব।''

     

    লকডাউনের মধ্যেই 2020 সালে প্রণীত হয়েছে নতুন জাতীয় শিক্ষানীতিসেই নীতিতে স্কুলে ভর্তির আগে শিশুকে প্রাক-প্রাথমিক স্কুলে পাঠানোর প্রয়োজনীয়তা স্বীকৃত হয়েছে এবং সেটাকে শিক্ষার অবিচ্ছেদ্য অঙ্গের মর্যাদা দেওয়া হয়েছেকিন্তু রণিত, রিয়ার মতো এমন হাজার হাজার শিশুর জীবন বিশ্বব্যাপী মহামারীতে থমকে রয়েছেএকটি বছর ছিনিয়ে নিয়েছে তাদের স্বাভাবিক বেড়ে ওঠার ছন্দ। বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশুরা বেড়ে ওঠার সময় একেবারে শুরুর দিকের একেকটি বছর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রাক-প্রাথমিক স্কুল বা প্রি-স্কুলে ভর্তি হলে শিশুর সর্বাঙ্গীণ বিকাশ হয় দ্রুততর। মনস্তত্ত্ববিদ কস্তুরী ঠাকুর জানালেন, “প্রি-স্কুল যেমন পদ্ধতিতে শেখায় তা বাড়িতে থেকে বাবা মায়েরা অনেকসময়েই পেরে ওঠেন না। কারণ, প্রি-স্কুলে আরও অনেক বাচ্চারা আসে, মেলামেশার অভ্যাস গড়ে ওঠার মধ্যে দিয়ে শিশুদের সামাজিকীকরণ হয়। বিভিন্ন ধরনের কার্যকলাপ, যেমন রং অনুযায়ী ব্লক সাজানো, খেলনা গোছানো প্রভৃতির মধ্যে নিযুক্ত থাকলে শিশুর চেতনামূলক বিকাশ (cognitive development) দ্রুত হয়। এছাড়াও রাগ, দুঃখ, আনন্দের অনুভূতিগুলোকে চিনতে শেখা এবং সেই অনুযায়ী আচরণ নিয়ন্ত্রণের পাঠ শিশুদের বিজ্ঞানসম্মত ভাবে সর্বাঙ্গীণ বিকাশে সাহায্য করে” তাঁর মতে, করোনার সংকটে শিশুরা শারীরিকভাবে নিরাপদ থাকলেও মনের দিক থেকে অনেকটাই পিছিয়ে পড়বে মূলত একাকীত্বর কারণে প্রি-স্কুলে যেতে না পারা, বাড়িতেও তাদের দেখাশোনা করার লোক না থাকা এবং বাবা মায়েদের সময় দিতে না পারা শিশুর মধ্যে বিচ্ছিন্নতার উদ্বেগ বা separation anxiety তৈরি করতে পারে।

     

    অভিভাবকদের দুশ্চিন্তার তাই শেষ নেই। করোনার সময়ে গৃহবন্দি আড়াই থেকে পাঁচ বছরের শিশুরা শিক্ষাক্ষেত্রে কতটা পিছিয়ে পড়ল? বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, সত্যপ্রিয় রয় কলেজ অফ এডুকেশনের অধ্যক্ষ, ড.সুবীর নাগের মতে, “সবথেকে দুর্ভাগ্য হল এইসব শিশুরা জানলই না যে তারা কী হারাল! শৈশবকালটা যখন সঙ্গী-সাথী নিয়ে খেলতে খেলতে একসঙ্গে শেখার বয়স, তখন তারা একা পড়ে গেল। অন্যান্য বয়সী শিক্ষার্থীদের মতো তাদের স্মার্টফোন ব্যবহার করে পারস্পরিক সংযোগ বজায় রাখার ক্ষমতাও নেই। ফলে শেখার দিক থেকে তারা কিছুটা তো পিছিয়ে যাবেই, এছাড়াও তাদের মধ্যে আচরণগত সমস্যা দেখা দিতে পারে, যাকে বলে প্রবলেম বিহেভিয়ার। বাড়ির পরিবেশে যেমন আচরণে অভ্যস্ত হবে, তা বাইরের দশজনের সামনে এক থাকবে না বাবা মায়েরা ব্যস্ততার মধ্যে বাড়িতে সময় দিতে না পারলে শিশুমনে জমা হতে পারে ক্ষোভ, রাগ এমনকি অবসাদও যা বাইরে থেকে বড়দের পক্ষে বোঝা সম্ভব হয় না অনেকসময়।'' তবে কি ভবিষ্যতে গুরুতর কোনও মানসিক সমস্যার সম্মুখীন হতে চলেছে এই প্রজন্মের শিশুরা?

     

    বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রভাব পড়লেও আশা করা যায় তা হবে সাময়িক। কীভাবে এর প্রতিকার সম্ভব? অভিভাবকদের পক্ষেই বা কী করণীয়?

     

    শিশুকে মনে হতে দেওয়া চলবে না যে সে গৃহবন্দি জানালেন কনসালটেন্ট ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট সাহেলী গঙ্গোপাধ্যায়। তাঁর কথায় “প্রি-স্কুলে যাওয়ার বয়সে বাচ্চারা observational learning stage-এ থাকে। যার অর্থ হল, তারা যা দেখবে তাই শিখবে। তাই এইসময়ে অভিভাবককে খুব সতর্ক থাকতে হবে। শিশুর সামনে হিংসাত্মক আচরণ, পারিবারিক অশান্তি বা ব্যক্তিগত ঘনিষ্ঠ মুহূর্ত কোনওভাবে যাতে উন্মোচিত না হয়ে পড়ে, সেইদিকে খেয়াল রাখা জরুরি শিশুকে সময় দেওয়ার অর্থ এই নয় যে, চাকরি ছেড়ে দিতে হবে বাবা-মা উভয়ের তরফ থেকেই শিশুর প্রতি সহমর্মিতা এবং সৌজন্যমূলক আচরণই শিশুর আচরণগত বিকাশ স্বাভাবিক রাখে। অভিভাবককে নিত্য নতুন কৌশল উদ্ভাবন করে বাড়ির মধ্যেই শিশুকে ব্যস্ত রাখতে হবে। অফিসের কাজের সময়টা ছবি আঁকার সরঞ্জাম, লেগো বা পাজল জাতীয় বুদ্ধি বিকাশের খেলা দিয়ে তাকে বসিয়ে রাখা যেতে পারে এছাড়াও নানান ছোটখাটো গৃহস্থালির কাজে শিশুকে অংশ করে নিলে তার আর নিজেকে অবাঞ্ছিত মনে হবে না। সবসময় মনে রাখতে হবে প্রতি শিশুর মধ্যেই রয়েছে অসীম সম্ভাবনা” অতএব, শিশুর মৌলিকত্ব এবং প্রতিভার স্ফূরণ যাতে ব্যাহত না হয় সেই দিকে অভিভাবককে খেয়াল রাখতে হবে।

     

    মনোবিজ্ঞানীরা সকলেই একমত যে, শিশুদের প্রতি অবহেলা বা অবজ্ঞা তাদের চারিত্রিক বিকাশের মূল অন্তরায়। তাই বাড়িতে আটকে পড়লেও যতটা সম্ভব সাহচর্যে রাখতে হবে শিশুদের। ওয়ার্ক ফ্রম হোমের ব্যস্ততা সামলেও কেবলমাত্র পারিবারিক বন্ধন ও সহমর্মিতার আবহে শিশুকে নিরাপত্তার আশ্বাস দিতে পারেন বাবা মা, এমনটাই জানালেন বিশেষজ্ঞরা। শিশুদের দিয়ে হালকা কাজ করানো, যেমন টবে গাছ পোঁতা ও নিয়মিত জল দিয়ে সেটির যত্ন করা,খাবার বানানোর সময় কিচেনে এটা সেটা এগিয়ে দেওয়া, ঘর সাজানোর সময় তাদের মতামত নেওয়া, এরকম বেশ কিছু নতুনত্বের স্বাদ দেওয়া গেলে অনেকটা সংযুক্তি এবং পারিবারিক বন্ধন তৈরি করা যেতে পারে বলে জানালেন মনস্তত্ত্ববিদ সহেলী যতদিন না প্রি-স্কুলে নিয়ে যাওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে, ততদিন বাড়িতে এইভাবেই তালিম দেওয়া যেতে পারে শিশুদের।এতে বেশি কিছু শেখা যদি নাও হয়, অন্তত বন্দিদশার একঘেয়েমি ও অবসাদ শিশুমনে দাগ কাটতে পারবে না।


    তিয়াস বন্দ্যোপাধ্যায় - এর অন্যান্য লেখা


    স্কুলেরও আগে যে শিক্ষা, তার থেকে এক বছর বঞ্চিত শিশুরা।

    অনলাইনে কিন্ডারগার্টেন হয় না-4thpillars