×
  • নজরে
  • ছবি
  • ভিডিও
  • আমরা

  • বিলকিস বানোর প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করল ভারত রাষ্ট্র

    সোমনাথ গুহ | 19-08-2022

    বিলকিস বানোর প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করল ভারত রাষ্ট্র

    বিলকিস বানোর জীবনে কুড়ি বছর আগের দুঃস্বপ্ন ফিরে এল, ‘আজাদি কা অমৃত মহোৎসব’ তাঁর কাছে হয়ে দাঁড়ালো এক মর্মান্তিক প্রহসন। স্বাধীনতার পঁচাত্তর বর্ষ পূর্তি উপলক্ষে লাল কেল্লার র‍্যাম্পার্ট থেকে তাঁর ভাষণে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী মহিলাদের মর্যাদা দেওয়া, তাঁদের ক্ষমতায়ন, নারীশক্তি সম্পর্কে বাগাড়ম্বর করলেন। তার কয়েক ঘণ্টা বাদেই কুড়ি বছর আগে যে পাষণ্ডরা বিলকিসকে গণধর্ষণ করেছিল, তাঁর মা ও বোনেদের ধর্ষণ করে খুন করেছিল, তাঁর তিন বছরের কন্যার মাথা পাথরে ঠুকে দিয়ে হত্যা করেছিল, তাদের জেল থেকে মুক্তি দেওয়া হল। ঘটনার আকস্মিকতায় বিলকিস বাকরহিত। তাঁর অসহায় প্রশ্ন, কোনও ধর্ষিতা মহিলার প্রতি বিচার কি এরকম নিষ্ঠুরভাবে শেষ হতে পারে?

    প্রতিহিংসা নয়, বিচার চেয়েছিলেন বিলকিস

    অথচ ওই নারকীয় ঘটনার পরেও বিলকিস কিন্তু বিচারব্যবস্থায় আস্থা রেখেছিলেন, অতীতের ক্ষতকে প্রশমিত করে নতুন করে জীবন গড়ে তুলছিলেন। কিন্তু গুজরাত সরকারের এই সিদ্ধান্ত তাঁর বিশ্বাসকে নাড়া দিয়ে দিয়েছে। এই অপরাধীদের মুক্তি দেওয়ার আগে কেউ তাঁর মতামত নেওয়ার প্রয়োজন মনে করেনি, তাঁর নিজের ও পরিবারের নিরাপত্তাকেও কেউ গুরুত্ব দেয়নি। গুজরাতের গ্রামের এই প্রায় অশিক্ষিত নারী তাঁর ওপর পাশবিক অত্যাচার, তাঁর পরিবার, বিশেষ করে তাঁর কন্যার মৃত্যুজনিত হিমালয়সম বিষাদকে সহ্য করে অত্যাচারীদের সাজা দেওয়ার জন্য সতেরো বছর ধরে প্রাণপাত করেছেন। আজ যখন ধর্মান্ধ সরকার সেই সাজাকে লঘু করে দিল, তখন তিনি মর্মাহত, কিন্তু তিনি বলছেন এই বিষণ্ণতা শুধু তাঁর নিজের জন্য নয়, সমস্ত নিপীড়িত নারীদের জন্য যাঁরা বিচারের জন্য সংগ্রাম করছেন।

    অথচ মাত্র তিন বছর আগে যখন সুপ্রিম কোর্ট তাঁকে 50 লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণ, বাড়ি ও চাকরি দেওয়ার রায় দেয় তখন তিনি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বলেছিলেন, আমার শান্তি হল, আমার দাবfর ন্যায্যতা প্রমাণিত হল। সুপ্রিম কোর্ট আমার বেদনা, যন্ত্রণা, 2002-এর গণহিংসায় ছিনিয়ে নেওয়া আমার সাংবিধানিক অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করার জন্য আমার লড়াইকে স্বীকৃতি দিয়েছে। কোনও নাগরিক যেন রাষ্ট্র দ্বারা পীড়িত না হয়, কারণ রাষ্ট্রের দায়িত্ব তাঁকে রক্ষা করা। স্মরণ করুন এই নারী বলেছিলেন তিনি বিচার চান, প্রতিহিংসা নয়। কতটা ভরসা থাকলে একজন নিপীড়িতা নারী এরকম দৃপ্ত কথা বলতে পারেন। তিনি আসামীদের মৃত্যুদন্ড দেওয়ারও বিরোধিতা করেছিলেন। শীর্ষ আদালতের উপর তাঁর এই অকৃত্রিম ভরসা আজ ভূলুণ্ঠিত।

    মুসলিম মহিলার হিন্দু ধর্ষকদের মুক্তির জন্য বিধি ভাঙা হল

    গুজরাতে ধর্ষকদের মুক্তি ও সংবর্ধনা কি একেবারে অপ্রত্যাশিত? সম্ভবত নয়। কারণ, কেন্দ্র তথা গুজরাতের এই শাসক দলের মুখ্যমন্ত্রী তো একদা বলেছিলেন যে মুসলিম নারীদের কবর থেকে তুলে ধর্ষণ করা উচিত, এই দলের সাধুসন্তরা অহরহ মুসলিম নারীদের গণধর্ষণ করার নিদান দেন, ধর্ষণের ঘটনা কভার করতে আসা সাংবাদিককে ইউএপিএতে অভিযুক্ত করে বছরের পর বছর জেলে ফেলে রাখে, আট বছরের বালিকাকে যারা ধর্ষণ করে তাদের সমর্থনে মিছিল করে। তাদের আশীর্বাদধন্য লোকেরাই তো আজ কোনও নিয়মকানুনের তোয়াক্কা না করে ঘৃণ্য আসামীদের সাজা হ্রাস করে দিল। কেন্দ্রের এবং বিভিন্ন রাজ্যের বিজেপি সরকারগুলি এখন দেশের আইন সংবিধানকে নিজেদের সুবিধা মতো ব্যাখ্যা করে। এটা তারা পারে কারণ পুরো সিস্টেমটাই এখন তাদের বশংবদ। রেমিশন (Remission) বা সাজা হ্রাস করা বা লাঘব করার একটা বিশেষ নীতি আছে। মহামান্য সুপ্রিম কোর্ট ইদানিং যে সব রায় দিচ্ছে, বা আইনের যা ব্যাখ্যা করছে তা যথেষ্ট প্রশ্ন তোলার অবকাশ রাখে, অনেকের অভিযোগ তা পক্ষপাতদুষ্ট। শীর্ষ আদালতের যুক্তি যেহেতু 2008 সালে সিবিআইয়ের বিশেষ আদালত আসামীদের যাবজ্জীবন কারাদন্ডে দন্ডিত করেছিলো, তাই 1922-এর রেমিশন পলিসি অনুযায়ী এদের সাজা লাঘব করা হবে। অথচ কেন্দ্রীয় সরকার 2014 সাল থেকে পুরানো পলিসি বাতিল করে নতুন নীতি লাগু করেছে। এই পলিসি অনুযায়ী ধর্ষণ, গণধর্ষণ, সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপ, দুর্নীতি, পণপ্রথার কারণে খুন, খুনের জন্য যাবজ্জীবন কারাদন্ডপ্রাপ্ত আসামী, ইউএপিএ, এনএসএ, রাষ্ট্রদ্রোহী আইন ইত্যাদিতে অভিযুক্তদের সাজা কোনও ভাবেই কমানো যাবে না। এই মর্মে কেন্দ্রের স্বরাষ্ট্র দপ্তর 10 জুন, 2022 প্রতিটি রাজ্য সরকারকে নির্দেশ পাঠিয়েছে। বিশিষ্ট মানবাধিকার কর্মী সুজাত ভদ্র বলছেন, শীর্ষ আদালতের 2012-এর একটি ধারা অনুযায়ী এই ধরণের আসামীদের সাজা কমাতে হলে ট্রায়াল কোর্ট যারা প্রথম সাজা দিয়েছে তাদের সম্মতি নিতে হবে। এ ছাড়াও যেহেতু এই ক্ষেত্রে তদন্তকারী সিবিআই একটি কেন্দ্রীয় সংস্থা প্রথম আসামীদের চার্জশিট দিয়েছিল, তাই কেন্দ্রীয় সরকারের অনুমতি আবশ্যক। তাই বলাই বাহুল্য গুজরাত সরকারের এই সিদ্ধান্ত মোদী-শাহের অনুমতি নিয়েই হয়েছে। এখন সুপ্রিম কোর্ট, রাজ্য ও কেন্দ্রীয় সরকার পরস্পরকে দোষারোপ করছে। বিলকিস বানোর হাহাকার তাদের এই কুৎসিত কলরবকে ছাপিয়ে সারা দেশ জুড়ে অনুরণিত হচ্ছে।

    আগামী দিনে ধর্ষকরা স্বস্তি পাবে, উৎসাহিত হবে

    গুজরাত গণহত্যার কুড়ি বছর বাদে আজও ‘দাঙ্গা’য় পীড়িত বহু মানুষ বাস্তুচ্যুত, সমাজচ্যুত। প্রায় আট হাজার পরিবার আতঙ্কে আর নিজের বাড়িতে ফিরে যাননি, তাঁরা ত্রাণ শিবিরেই বাস করেন। মুসলিম সম্প্রদায় ঘেটোর সঙ্কীর্ণ, বদ্ধ পরিবেশে নিমজ্জিত, অভিজাত এমনকি মধ্যবিত্ত এলাকায়ও তাঁদের পরিবেশ অলিখিত ভাবে নিষিদ্ধ। এই পরিপ্রেক্ষিতে সরকারের এই সিদ্ধান্ত বেআইনি, অনৈতিক এবং চূড়ান্ত বিবেচনাহীন; তারা কি একবারও বিলকিস বানো ও তাঁর পরিবারের নিরাপত্তার কথা ভেবে দেখেছে? এই সিদ্ধান্ত তাঁর স্বামী ইয়াকুব রসুলকে হতবাক করে দিয়েছে। তিনি বলেছেন কেউ তাঁদের মতামত নেয়নি। তিনি কাতরভাবে প্রশ্ন করেন, তাঁরা যে পুনরায় আক্রান্ত হবেন না সেটার কি কোনও নিশ্চয়তা আছে? সুপ্রিম কোর্টের রায় তো রাজ্য সরকার পুরোপুরি মানেনি। তারা বিলকিসকে ক্ষতিপূরণ দিয়েছে যে টাকা দিয়ে তিনি তাঁর ছেলেমেয়েদের শিক্ষার ব্যবস্থা করেছেন। কিন্তু তাঁদের কোনও বাড়ি বা চাকরি আজও দেওয়া হয়নি। ইয়াকুব বলেন এখনও তাঁদের কোনও স্থায়ী ঠিকানা নেই, তাঁদের মাঝেমধ্যেই বাড়ি পালটাতে হয়, লুকিয়ে থাকতে হয়। 

    বিজেপি সরকারের এই সিদ্ধান্ত উন্নাওয়ের ভূতপূর্ব বিধায়ক কুলদীপ সিং সেঙ্গারকে পুলকিত করবে। স্মরণ করুন 2017 সালে সে এক নাবালিকাকে ধর্ষণ করেছিল। অভিযোগ মেয়েটির পিতার মৃত্যু এবং একটি ‘সাজানো’ দুর্ঘটনায় তাঁর আত্মীয়দের মৃত্যুতেও সেঙ্গারের হাত ছিল। একজন যাকে বলে দানবীয় ‘সিরিয়াল অফেন্ডার’, তাঁর সাজা শুধু যাবজ্জীবন নয় সারা জীবনের কারাদন্ড। কয়েক মাস আগেই সে জামিনের আবেদন করেছে কারণ সে পাঁচ বছর কারাবাসে আছে! কী আস্পর্ধা! কিন্তু যে কোনও দিন হয়তো শোনা যাবে তিনি মুক্ত। একই ভাবে হাথরস বা কাঠুয়া ধর্ষণ মামলার আসামীরাও নিশ্চয়ই গুজরাত সরকারের এই সিদ্ধান্তে উল্লসিত। তারাও শীঘ্রই হয়তো মুক্ত আকাশের নীচে এসে দাঁড়াবে এবং সারা বিশ্ব জানবে ভারতবর্ষে শাসক দলের আশীর্বাদধন্য হলে ধর্ষণ করেও বেমালুম পার পাওয়া যায়।

    বিলকিসের স্বপ্নের কী হবে?

    বিলকিস বানো চেয়েছিলেন তাঁর কন্যা নিরাপদ ভারতবর্ষে বড় হবে। সে আইনজীবী হবে, তাঁর মক্কেলের হয়ে আদালতে সওয়াল করবে। চারপাশের ঘনায়মান অন্ধকারে সেটা যেন নিছক কল্পনা হয়ে যাচ্ছে। প্রতিদিন সন্ধ্যাবেলায় স্টুডিও আলো করে যে সব সঞ্চালক/সঞ্চালিকারা মোদী-শাহ সরকারের হয়ে রোজ ঢোল করতাল বাজায়, তাদের ঘরে কি মা বোনেরা নেই, তারা কি তাদের নিরাপত্তা নিয়ে ভাবে না! তাদের কথাবার্তা শুনলে মনে হয় সারা দেশটাই যেন পদলেহনকারীদের একটা কারখানা হয়ে গেছে। 2002-এর তেসরা মার্চ বিলকিস যখন গুণ্ডাদের তাড়ায় গ্রাম থেকে গ্রাম পালাচ্ছিলেন তখন ধর্ম সম্প্রদায় নির্বিশেষে মানুষ তাঁকে আশ্রয় দিয়েছেন। তিনি যখন প্রায় নগ্ন হয়ে ঝোপের মধ্যে লুকিয়ে ছিলেন তখন এক আদিবাসী রমণী তাঁকে জল খাইয়েছেন, পোশাক দিয়েছেন। একজন কনস্টেবল তাঁকে থানায় নিয়ে গেছেন। সব মানুষ তাঁবেদার হয়ে যায়নি। তারা চুপ করে আছেন, অসহায় বোধ করছেন, ভরসা করার মতো রাজনৈতিক শক্তি তাঁরা পাচ্ছেন না। তাদের রাস্তায় আনতে হবে। এখানেই বিরোধীদের ভূমিকা। কিন্তু কংগ্রেস ও বাম বাদে বাকি দলগুলির প্রতিবাদ ক্ষীণ! হিন্দু ভোট পাবার অলীক আশায় তাদের প্রতিবাদ মামুলি বিবৃতি ছাড়া কিছু নয়। নাগরিক সমাজ ভরসা। সমমনস্ক দলগুলির সাথে মিলে গুজরাত সরকারকে বাধ্য করতে হবে এই সিদ্ধান্ত খারিজ করতে। ‘পৃথিবীর জঞ্জাল’ সরাতে তো হবেই, সুকান্তর কবিতা কিঞ্চিৎ পরিবর্তন করে আওয়াজ তুলতে হবে, এ বিশ্বকে শিশু ও নারীর বাসযোগ্য করে যাব আমি।

    #BilkisBano #Godhra2002 #VHP_felicitates_rapists


    সোমনাথ গুহ - এর অন্যান্য লেখা


    কট্টর হিন্দুত্ববাদী সংস্থাগুলি সোশাল মিডিয়ায় যে ভুয়ো ভিডিও প্রচার করে থাকে, সেগুলোকেই তারা প্রামাণ্য

    এটা পরিষ্কার কেন্দ্রীয় সরকার করোনা মহামারীর সুযোগ নিয়ে সমস্ত বিরোধী স্বর স্তব্ধ করার চেষ্টা করছে

    হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলির গণহত্যার আহ্বানে সরকার নীরব থাকলে নাৎজি জার্মানির স্মৃতি ফিরে আসতে বাধ্য।

    রবীন্দ্রনাথের বিশ্বভারতী এখন রাজনীতির আখড়ায় পরিণত হয়েছে।

    এই সব অঞ্চলে উন্মুক্ত কয়লা খননের কারণে পরিবেশের সমূহ ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা আছে।

    প্রায় আশি বছর আগে গ্যাবো-মার্সেদেস রূপকথার সূচনা।

    বিলকিস বানোর প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করল ভারত রাষ্ট্র-4thpillars

    Subscribe to our notification

    Click to Send Notification button to get the latest news, updates (No email required).

    Not Interested