Support 4thPillars

×
  • আমরা
  • নজরে
  • ছবি
  • ভিডিও

  • বলি, হিন্দু কীসে হয়?

    তিয়াস বন্দ্যোপাধ্যায় | 17-03-2021

    প্রতীকী ছবি।

    রায়বাবু রোজ সকালে হাতে হেঁটে অফিস যান। সঙ্গে একটি কুমির যায় লাফাতে লাফাতে। সে যেন রায়বাবুর সঙ্গে পাল্লা দিতেই পারে না। একবার ছোটে তো একবার হাঁটে। এইরূপে দিব্যি দিন কাটছিল। একদিন সকালে টুথব্রাশ মুখে কোনও এক ধার্মিক গোটা বিষয়টা খেয়াল করলেন।


    এ কী অলুক্ষণে ব্যাপার! দু’টি পা থাকা সত্ত্বেও হাতে হেঁটে পথ চলা তো মানুষের ধর্ম নয়! অন্যদিকে, সরীসৃপ মাত্রই বুকে হাঁটে। রাস্তা ধরে রায়বাবুর পাশে লাফাতে লাফাতে অফিসে যাওয়া একটা কুমিরের পক্ষে নিতান্তই বেমানান। অতএব, রায়বাবু এবং কুমির উভয়েই ধর্মচ্যুত হয়েছে, এ বিষয়ে নিশ্চিত হয়ে ক্ষুণ্ণ মনে ধার্মিক বাথরুমে গিয়ে মুখ ধোওয়ার জন্য বেসিনের কল খুললেন। দেখলেন জলের ধারা গড়িয়ে ওপরের দিকে উঠে যাচ্ছে, তাঁর হাতে আর নামেই না! তবে কী জল ও...! তিনি মাথায় হাত দিয়ে মেঝেয় বসে পড়তে চাইলেন, কিন্তু পরক্ষণেই সম্বিত ফিরে পেয়ে দেখলেন মাথা নিচে, পা উপরে হয়ে বাথরুমের ছাদে তিনি বাদুড়ের মতো ঝুলে রয়েছেন।


    এই বিশ্বে যে যার ধর্ম অনুযায়ী আচরণ করবে, সেটাই তো স্বাভাবিক। বাস্তবতা হল প্রাণী এবং জড় জগতের আদর্শ ধর্মাচরণের সমাহার। অন্তত ধার্মিকের এমনটাই বিশ্বাস ছিল। কিন্তু সবকিছু এত দ্রুত বদলে গেল যে, এখনই আর মাটির পৃথিবীতে পা পাওয়ার আশা দেখলেন না ধার্মিক। ততদিনে নিচে নতুন যুগের সূচনা হয়েছে। রাস্তায় পা রেখে রামবাবু, সিরাজুল মিঞা এবং মিস্টার টমসন নির্বিঘ্নে অফিস করছেন। কুমিররা খাল-বিলে জল থেকে মাথা তুলে রোদ পোহাচ্ছে। কেউ কেউ অভয়ারণ্যের ঘেরাটোপে ফুর্তিতে আছে। যদিও একই পাড়ার রায়বাবু আর অপদার্থ কুমিরটা এসব খেয়াল করে কিনা ধার্মিক জানেন না। তিনি শঙ্কিত বক্ষে সবই লক্ষ্য করেন, আর ভাবেন তাঁর যদি একটা নতুন ধর্ম’ থাকত, তবে আর ঝুলে থাকতে হত না।


    সচল সভ্যতার নতুন ধর্মগুলোর মধ্যে কোনটা যে তাঁর জন্য উপযুক্ত, সেই নিয়েই আমাদের পুরনো যুগের ধার্মিক জ্ঞানার্জন করার চেষ্টায় ব্রতী হলেন। বুঝলেন আধুনিক সময়ে ধর্মের ধারণা অত্যাশ্চর্য। হিন্দু, মুসলিম, খ্রিস্টান, ইহুদি, শিখ, বৈষ্ণব, বৌদ্ধ প্রভৃতি হরেকরকম মতাদর্শে বিশ্বাসী গোষ্ঠীকেই এক একটি ধর্মীয় সম্প্রদায় বলা হচ্ছে, এখানে ব্যাকডেটেড অনুশীলন তত্ত্ব’র জায়গা নেই। মোটের ওপর মাথার নিচের বিশ্বে সংখ্যাগরিষ্ঠের মূল ধর্ম তিনটি: হিন্দু ধর্ম, ইসলাম ধর্ম এবং খ্রিস্ট ধর্ম। তবে ভারতে থাকতে গেলে ইদানীং নাকি হিন্দু ধর্মাবলম্বী হওয়াই বাঞ্ছনীয়। নতুবা সরকার নিরাপত্তা দিতে অস্বীকৃত হতে পারে। এই পর্যন্ত বুঝতে পেরে পুরনো ধার্মিক ভাবলেন আজ থেকে তিনি আর নিজেকে ধার্মিক’ নয়, অধার্মিক ভাববেন। যতদিন না হিন্দু হয়ে উঠতে পারছেন, তাঁর জীবনের কোনও দাম নেই।


    অতঃপর হিন্দুধর্ম নিয়ে জোরদার চর্চা করতে লাগলেন আমাদের ঝুলে থাকা অধার্মিক। বেদ-উপনিষদের পাঠ ছোটবেলায় নিয়েছেন অধার্মিক। কিন্তু বর্তমান হিন্দু ধর্মের সঙ্গে ব্রহ্ম উপাসনার কোনও সম্পর্ক নেই


    রামায়ণ মহাভারত তো কণ্ঠস্থ। অনবদ্য দুই মহাকাব্য হিসেবেই এগুলি হৃদয়ে দাগ কেটেছিল এতদিন। কিন্তু মহাকাব্য থেকে যে ধর্ম তৈরি হতে পারে, এমন আশ্চর্য কথা তাঁর জানা ছিল না। হিন্দুদের ধর্মগুরু খুঁজছিলেন শুরুতে, তেমন কাউকে পেলেন না। তারপর পুরাণ ঘেঁটে দেখলেন, তেত্রিশ কোটি দেব-দেবীর নাম এই বয়সে আর মুখস্থ করা সম্ভব নয়। খ্রিস্টধর্মে চার্চে গিয়ে ধর্মান্তরিত হওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। ইসলাম ধর্মে দীক্ষা নেয়ারও উপায় রয়েছে। কিন্তু হিন্দু হবেন কী করে তা বুঝে উঠতে পারলেন না। এটা কি ডাক্তারি শাস্ত্রের মত থিয়োরি প্র্যাকটিকাল সমেত পদ্ধতি? তাহলে তিনি তো পারবেন  না। পুনরায় ইতিহাস অনুসন্ধানে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন, যদি আর কোনও পথ থাকে!


    ইতিমধ্যে একদিন দেখলেন আগের পাড়ার রায়বাবু এবার পায়ে হেঁটে নিচের ভারতবর্ষে অফিসে যাচ্ছেন। সকালে বাস স্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে। পাশে কুমিরের বদলে মুখার্জিবাবু। আশ্চর্য দৃশ্য। সহসা অধার্মিকের মনে হল রায়বাবু তাঁকে ফাঁকি দিয়ে নিজের আখের গুছিয়ে ফেলেছেন বেশ। কিন্তু কোন পথে হিন্দু হলেন তিনি, সেটা তো জানতেই হবে। তাই সন্তর্পণে বাস স্ট্যান্ডের কথোপকথনে ফোকাস করলেন
     

    রায়বাবু: এ বছরও ভোটটা বিজেপিকেই দেব ঠিক করেছি। রামরাজ্যই তো আদর্শ। মুসলিম ব্যাটারা বড্ড বার বেড়েছে। ছাড়খার করে দিয়েছে দেশটাকে। ওদেরকে টাইট দিতে পারে এমন পার্টি আর কই!

     
    মুখার্জিবাবু: তা যা বলেছ। তৃণমূলের সবই তো বোকাপাঁঠার দলএতদিন ধরে মুসলিমদের তোল্লাই দিল, ভোট যাতে হাতছাড়া না হয়। ওদের আশকারাতেই তো আজ রাজ্যের এই অবস্থা। শিল্প নেই, চাকরি নেই, মানুষের মুখে হাসি নেই। এইদিন বদলাবে যখন মোদী সরকার পশ্চিমবঙ্গেরও দায়িত্ব নেবে

     
    রায়বাবু: বাঙালি মেয়েমানুষ কি আর রাজ্য চালাতে পারে! কাগের ঠ্যাং বগের ঠ্যাং কথা বলে পার পেয়ে যাচ্ছে দলে অতগুলো গুন্ডা পুষেছিল বলে। আরে বোঝো না? ফুল টাইম প্রোটেকশন। তার মধ্যে আবার সিনেমার হিরো আর হিরোইনদের পয়সা দিয়ে ভাঙিয়ে এনেছে। সেইসব তো সাধারণ মানুষেরই পয়সা

     
    মুখার্জিবাবু: বিজেপির পয়সা কম ভাবছ? সবকটাকে কিনে নিচ্ছে দেখছ না? লোকে ঘাস খেয়ে আর কতদিন থাকবে, পদ্মফুলেই এসে বসতে হবে দেখো। আমি কিন্তু আশাবাদী। জয় শ্রী রাম!

     
    রায়বাবু: জয় শ্রী রাম! ওদিকে বামেরা আবার মুসলিমদের সঙ্গে জোট বেঁধেছে। কী লজ্জা! ওদের কীর্তন যে কোথা থেকে কোথায় গড়ায় তার হিসেব নেই। এত বছর দাদুদের দেখলাম খাবি খেতে। এখন আবার ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের নিয়ে দল সাজিয়ে চটুল গান বানাচ্ছে। এরা নাকি আবার...

     
    ওই আমার বাস এল, এগোলাম গো।

     
    অধার্মিক গালে হাত দিয়ে ঝুলতে লাগলেন, এসব কী! বামের আগে রামনাম শুনলেন যেন কয়েকবার...তাহলে কী রামায়ণের সঙ্গে হিন্দু হওয়ারও কোনও যোগ আছে?

     
    নিচের রাস্তাঘাটে নজর রাখতে শুরু করলেন দিনরাত। দেখলেন গেরুয়া উত্তরীয় গলায়, গেরুয়া পতাকাধারী ঝাঁক ঝাঁক মোটরবাইক আরোহী স্লোগান দিতে দিতে যাচ্ছে ঘণ্টায় ঘণ্টায়কান পেতে স্পষ্ট শুনলেন সেই আক্রোশ ভরা চিৎকার জয় শ্রী রাম’! আর একবার একদল রংবেরঙের মিছিল প্রত্যক্ষ করলেন, তাতে বিভিন্ন বয়সী মানুষের ঢল। সেই দল প্ল্যাকার্ড ধরে আছে ‘No vote to BJP’ এবং বিজেপিকে একটিও ভোট নয়’। অধার্মিকের হিসেবটা ঘেঁটে গেল। তাহলে কি নিচে নামতে গেলে হিন্দু নয়, বিজেপি হতে হবে? তেত্রিশ কোটি দেবতার সঙ্গে তবে হিন্দুধর্মের তেমন কিছু নেই। আছে রামের সঙ্গে। রাম কি দেবতা? তাহলে তো ফেলুদাও দেবতা। দু’জনেই জনপ্রিয় নায়ক এ’টুকু ধার্মিক জানেন। এর আগে খোঁজ খবর করে জেনেছেন জয় শ্রী কৃষ্ণ’ বলার চল রয়েছে বৈষ্ণবদের মধ্যে। অর্জুন সারথী শ্রীকৃষ্ণ মহাভারতের নায়ক, আবার মোহনমুরলী বংশীধারী হিসেবে রাসলীলারও নায়ক। কিন্তু কোনওদিন প্রত্যক্ষভাবে যুদ্ধ করেননি। তাই রণছোড়’জী তাঁর অপর পরিচয়। বৈষ্ণব দর্শনের সঙ্গে এই প্রেমময় বীরত্ব এবং অহিংসার ব্যাপারটা মেলে। আর রাম একজন বিতর্কিত নায়ক বই আর কিছু তো নয়। যিনি কিনা মুখ তথা পৌরুষ রক্ষা ছাড়া অন্য কিছুই করেননি জীবনে। অযোধ্যা থেকে শ্রীলঙ্কা অবধি গোটা রামায়ণ জুড়ে কেবল রামের নায়ক সাজার চেষ্টা। বালিকে হাত করার জন্য সুগ্রীবকে বধ করেন। লঙ্কা ছারখার করে, এত যুদ্ধ করে বীরত্ব দেখিয়ে সীতাকে উদ্ধার। আবার প্রজাদের মন রাখতে তাঁকেই বিসর্জন! এমন নায়ককে আইডল হিসেবে চয়ন হিন্দুধর্মের চারিত্রিক তাৎপর্য নয় তো?

     
    অধার্মিক এবার চিন্তিত হলেন। কবে থেকে একটা সমীকরণে আসার চেষ্টা চালাচ্ছেন দিন রাত, সেটা মিলল না। এখন ভেঙেচুরে একটা অভেদ তৈরি হতে লাগল- বিজেপি=হিন্দুত্ব=রাম=!? ভারতের মাটিতে নামতে গেলে তবে এতকালের ধর্ম বিসর্জন দিতে হবে? তারপরও কি হিন্দু হওয়ার বাসনা পূরণ হবে তাঁর?


    কাজ নেই। ঝুলে থাকাই ভাল। তিনি আবার আজ নিজেকেই ধার্মিক’ ভেবে আস্তে আস্তে উঠে দাঁড়ালেনদেখলেন মাথা নিচে রেখেও হাঁটতে পারছেন। পায়ের উপরের মাটি শক্ত। আর কোনও অসুবিধে হচ্ছে না


    তিয়াস বন্দ্যোপাধ্যায় - এর অন্যান্য লেখা


    স্কুলেরও আগে যে শিক্ষা, তার থেকে এক বছর বঞ্চিত শিশুরা।

    পড়ুয়াদের মনের অতলে কী চলছে, তা জানতে ব্যর্থ হচ্ছে সরকারি স্কুলগুলি।

    ফেসবুক বা সোশাল মিডিয়ায় অনেক পুরুষের কাছে নারী মানেই সহজে সস্তায় পণ্য।

    অধার্মিক হওয়ার অনেক জ্বালা, ধার্মিকের দায় শুধু নিঃশর্ত আনুগত্যেই।

    সিঙ্গুরে মাস্টারমশাই সত্যিই তো ইতিহাস যে তালগোল পাকিয়ে দিলেন একেবারে।

    চিড়িয়াখানায় খাঁচার ভিতরের চেয়ে বাইরে বেশি আমোদ।

    বলি, হিন্দু কীসে হয়?-4thpillars

    Subscribe to our notification

    Click to Send Notification button to get the latest news, updates (No email required).

    Not Interested